চামড়াশিল্পের ক্ষতিকর বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে শিল্পে ব্যবহারের প্রোটিন গুঁড়া ও জেলাটিন, রপ্তানিও শুরু; তবে খাদ্যনিরাপত্তায় কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারির ওপর
বিশেষ প্রতিবেদন | TODAY TV BD
বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কঠিন বর্জ্য। বছরের পর বছর এসব বর্জ্যের একটি অংশ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা, অপরিকল্পিতভাবে সরিয়ে নেওয়া এবং অবৈধ কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ বর্জ্যের কিছু অংশ মুরগি ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহারের ঘটনাও অতীতে গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় ছিল ক্রোমিয়ামযুক্ত চামড়ার উচ্ছিষ্ট, যা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এবার সেই বর্জ্যকে শিল্পের কাঁচামালে পরিণত করার নতুন উদ্যোগ সম্ভাবনার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনাকেও সামনে এনেছে। চীনা বিনিয়োগে সাভারের নয়ারহাট এলাকায় গড়ে ওঠা দুটি প্রতিষ্ঠান ট্যানারির বর্জ্য থেকে শিল্পে ব্যবহারের প্রোটিন গুঁড়া এবং জেলাটিন তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি নিয়ে সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল থেকে তারা প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
এটি নিঃসন্দেহে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর অর্থ এই নয় যে সাভারের সব ট্যানারি বর্জ্য ইতিমধ্যে নিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, কিংবা মুরগি, ডিম ও মাছের সব ধরনের ভারী ধাতুদূষণের ঝুঁকি দূর হয়ে গেছে। বরং এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কত বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, ক্রোমিয়াম কীভাবে পৃথক করা হচ্ছে, অবশিষ্ট ক্ষতিকর পদার্থ কোথায় যাচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার ওপর।
ট্যানারি বর্জ্য থেকে রপ্তানিপণ্য
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের ওয়েনঝৌ ইউয়ানফেই গোষ্ঠীর বিনিয়োগে বাংলাদেশে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড এবং ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান ট্যানারি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করছে। প্রতিষ্ঠান দুটি সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কাছাকাছি নয়ারহাট এলাকায় কারখানা স্থাপন করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান দুটির সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। তারা ট্যানারির বর্জ্য থেকে শিল্পে ব্যবহারের প্রোটিন গুঁড়া ও জেলাটিন তৈরি করছে। ২০২৫ সাল থেকে চীন, কম্বোডিয়া ও অন্যান্য দেশে তাদের রপ্তানির মোট মূল্য প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার—এর মধ্যে জেলাটিনের মূল্য প্রায় ১৩ লাখ এবং প্রোটিন গুঁড়ার মূল্য প্রায় তিন লাখ ডলার। হংকং থেকে জেলাটিনের জন্য চার লাখ ডলারের একটি ক্রয়াদেশ পাওয়ার কথাও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তাদের কারখানায় বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন ট্যানারি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার কার্যক্রম চলছে। জেলাটিন উৎপাদনের বার্ষিক সক্ষমতা পাঁচ হাজার টন বলে জানানো হয়েছে। তবে উৎপাদনক্ষমতা ও প্রকৃত বার্ষিক উৎপাদন এক নয়। সব যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও অন্যান্য ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর থাকলেই ঘোষিত সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে আবার বলা হয়েছিল, কারখানায় পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলেও পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য নির্মাণকাজ তখনো শেষ হয়নি। দুই প্রতিবেদনের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনায় বলা যায়, কিছু পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু হয়েছে, কিন্তু সাভারের পুরো ট্যানারি শিল্পনগরীর সব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ইতিমধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি এখনো নিশ্চিত নয়।
কীভাবে বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন পণ্য?
চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সময় বিভিন্ন ধরনের কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে চামড়ার ছোট টুকরা, ছাঁট, অতিরিক্ত চামড়া অপসারণের পর পাওয়া অংশ এবং ক্রোমিয়ামযুক্ত ভেজা চামড়ার গুঁড়া ও কাটিং।
চামড়া শক্ত ও টেকসই করতে প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ক্রোমিয়াম ব্যবহার করা হয়। তাই সব চামড়ার বর্জ্য এক ধরনের নয়। কোন বর্জ্যে ক্রোমিয়াম আছে, কোনটিতে নেই এবং কোনটিতে অন্য রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে—তা পরীক্ষা করে আলাদা করা জরুরি।
নতুন উদ্যোগে বর্জ্য থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য তৈরির কথা বলা হয়েছে।
শিল্পে ব্যবহারের প্রোটিন গুঁড়া: চামড়াশিল্পে প্রস্তুত চামড়াকে নরম করার কাজে এ ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হয়। এটি মুরগি বা মাছের খাবার তৈরির প্রোটিন নয়। অর্থাৎ এ পণ্যকে পশুখাদ্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
জেলাটিন: নির্দিষ্ট মান পূরণকারী জেলাটিন ওষুধের ক্যাপসুলের খোলস তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ওষুধশিল্পে জেলাটিন ও ক্যাপসুল-সংশ্লিষ্ট কিছু উপকরণ আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে মানসম্মত জেলাটিন উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ট্যানারি বর্জ্য থেকে উৎপাদিত জেলাটিন ওষুধশিল্পে ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা শুধু উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। ক্রোমিয়ামসহ দূষকের অবশিষ্টাংশ, রাসায়নিক বিশুদ্ধতা, জীবাণু এবং সংশ্লিষ্ট ওষুধশিল্পের মানদণ্ড পূরণের প্রমাণ প্রয়োজন।
মুরগির খাদ্যে ট্যানারি বর্জ্য: অতীতের উদ্বেগ কতটা বাস্তব?
এ বিষয়ে উদ্বেগের ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের গবেষণায় ট্যানারির কিছু বর্জ্য এবং সেই বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি কিছু পশুখাদ্যে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ট্যানারির বর্জ্য, মুরগির খাবার এবং সেই খাবার খাওয়া মুরগির শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষকেরা কিছু বর্জ্য ও খাদ্যের নমুনায় অত্যন্ত বেশি মাত্রার ক্রোমিয়াম শনাক্ত করেন। কিছু দূষিত খাদ্য খাওয়া মুরগির দেহেও ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। গবেষণাটি দেখিয়েছে, ক্রোমিয়ামযুক্ত ট্যানারি বর্জ্য পশুখাদ্যে ব্যবহার করা হলে খাদ্যশৃঙ্খলে দূষণ প্রবেশের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।
এ কারণে ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহার করে মুরগি ও মাছের খাবার তৈরির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে হাইকোর্ট ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে পশুখাদ্য উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেন। ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। পরবর্তী বছরগুলোতেও বর্জ্য অবৈধভাবে পশুখাদ্যে ব্যবহারের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন পুনর্ব্যবহার উদ্যোগটি এমন একটি সমস্যা মোকাবিলার সম্ভাবনা তৈরি করছে, যার পেছনে শুধু আশঙ্কা নয়, আদালতের নির্দেশনা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাও রয়েছে।
২০২৪ সালের গবেষণা কী বলছে?
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি মাঠভিত্তিক গবেষণায় সাভার এলাকার ২০টি ট্যানারি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। গবেষণায় কিছু প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পশুখাদ্য তৈরিতে বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। তবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, দেশের মোট ট্যানারি বর্জ্যের তুলনায় পশুখাদ্যে ব্যবহৃত বর্জ্যের অংশ তাঁদের গবেষণায় সীমিত ছিল। পরীক্ষিত নিবন্ধিত খাদ্য উৎপাদনকারীদের কিছু নমুনায় ক্রোমিয়াম ও সীসার পরিমাণও কম পাওয়া যায়।
এ ফল থেকে দুটি বিষয় বোঝা যায়। প্রথমত, ট্যানারি বর্জ্য পশুখাদ্যে ব্যবহারের সমস্যা একেবারে কাল্পনিক নয়। দ্বিতীয়ত, সব পশুখাদ্য দূষিত কিংবা দেশের সব মুরগি ও ডিমে ক্রোমিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনক—এমন সার্বিক সিদ্ধান্তও এই গবেষণা সমর্থন করে না।
গবেষণাটি নির্দিষ্ট এলাকার সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ওপর করা। জাতীয় পর্যায়ের প্রকৃত অবস্থা জানতে আরও বড় নমুনা, বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্যকল, কাঁচামাল ও খামার অন্তর্ভুক্ত করে নিয়মিত পরীক্ষা প্রয়োজন।
ট্যানারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে কি মুরগি ও ডিম নিরাপদ হবে?
ঝুঁকির একটি উৎস নিয়ন্ত্রণে এলে উপকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্যানারির ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য যদি খোলা জায়গায় পড়ে না থাকে, অবৈধ ব্যবসায়ীদের হাতে না যায় এবং পশুখাদ্যে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ হয়, তাহলে সেই নির্দিষ্ট দূষণপথের ঝুঁকি কমতে পারে।
কিন্তু মুরগি ও ডিমে ভারী ধাতু পৌঁছানোর একমাত্র পথ ট্যানারি বর্জ্য নয়।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি খাদ্যনিরাপত্তা গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কিছু খামারের পানি ও খাদ্যের উপাদানেও ভারী ধাতুর উপস্থিতি ছিল। গবেষণায় মুরগির মাংস ও ডিমের গড় ক্রোমিয়াম, সীসা ও ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ অনুমোদিত সর্বোচ্চ সীমার নিচে ছিল বলে জানানো হয়। তবে খামারের পানির কিছু নমুনায় সীসা ও ক্যাডমিয়ামের দূষণ এবং ভুট্টার মতো খাদ্য উপাদানে ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
এর অর্থ হলো, শুধু ট্যানারির বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করলেই পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। পশুখাদ্যে ব্যবহৃত ভুট্টা, ধানের কুঁড়া, তেলবীজের খৈল, মাছের গুঁড়া, খনিজ মিশ্রণ এবং পানির মানও পরীক্ষা করতে হবে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশি একটি গবেষণায় বাজারে পাওয়া কিছু মুরগির খাদ্য ও মুরগির বিভিন্ন অংশে ভারী ধাতু পরীক্ষা করে কিছু নমুনায় উদ্বেগজনক মাত্রা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালে শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকার মুরগির খাদ্য, মাংস ও ডিম নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনাগুলোতে ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম শনাক্তকরণসীমার নিচে ছিল; সীসা ও তামার পরিমাণও প্রযোজ্য সীমার নিচে পাওয়া যায়।
গবেষণাগুলোর ফল এক নয়, কারণ নমুনার স্থান, সংখ্যা, সময় ও পরীক্ষাপদ্ধতি আলাদা। এ পার্থক্যই দেখায় যে কয়েকটি গবেষণার ভিত্তিতে পুরো দেশের মুরগি ও ডিমকে নিরাপদ অথবা বিপজ্জনক ঘোষণা করা যায় না। এর জন্য ধারাবাহিক ও প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় নজরদারি প্রয়োজন।
ক্রোমিয়াম পৃথক করার পর বর্জ্যের কী হয়?
নতুন শিল্প উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত প্রশ্ন এখানেই।
ক্রোমিয়াম পৃথক করা হলে তা কোথাও না কোথাও জমা হবে। সেই ক্রোমিয়ামসমৃদ্ধ অবশিষ্টাংশ কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে—তার তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য একটি পণ্য থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় ফেলে দিলেই পরিবেশগত সমস্যার সমাধান হয় না।
একইভাবে, কারখানার নিজস্ব বর্জ্যপানি পরিশোধনাগার থাকা ভালো পদক্ষেপ; কিন্তু এটি একাই কঠিন বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করে না। বর্জ্যপানি এবং ক্রোমিয়ামযুক্ত কঠিন অবশিষ্টাংশের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
সুতরাং পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন এবং ট্যানারি শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর উচিত নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করা। কী পরিমাণ বর্জ্য ঢুকছে, কত পণ্য তৈরি হচ্ছে, কত ক্রোমিয়াম পৃথক হচ্ছে, অবশিষ্টাংশ কোথায় যাচ্ছে এবং পরিশোধিত পানি ও উৎপাদিত পণ্যের পরীক্ষার ফল কী—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে উদ্যোগটির পরিবেশগত উপকার যাচাই করা সম্ভব হবে।
ক্রোমিয়ামমুক্ত বর্জ্যের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানও এগোচ্ছে?
সংশ্লিষ্ট একটি বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, ক্রোমিয়ামমুক্ত বা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির ট্যানারি বর্জ্য শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। তবে এই তিন প্রতিষ্ঠানের নাম, আবেদনগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং অনুমোদনসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথিতে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য নয়, ট্যানারি শিল্পের অন্য কঠিন বর্জ্যও সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হতে পারে। তবে বর্জ্যটি ক্রোমিয়ামমুক্ত কি না, অন্য রাসায়নিকের দূষণ রয়েছে কি না এবং চূড়ান্ত পণ্য কোন কাজে ব্যবহার হবে—এসব পরীক্ষার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সামনে সরকারের করণীয়
প্রথমত, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে বছরে কত ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রকাশ করতে হবে। ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য, ক্রোমিয়ামমুক্ত বর্জ্য, চামড়ার ছাঁট ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করে হিসাব রাখা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বর্জ্য সংগ্রহ থেকে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের নথি সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে কোনো বর্জ্য গোপনে পশুখাদ্য তৈরির কারখানায় চলে যেতে না পারে।
তৃতীয়ত, মুরগি ও মাছের খাদ্য প্রস্তুতকারকদের কাঁচামালভিত্তিক পরীক্ষার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা জরুরি। শুধু প্রস্তুত খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা নয়, ভুট্টা, ধানের কুঁড়া, খৈল, মাছের গুঁড়া ও খনিজ উপাদানের নমুনাও পরীক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, নির্দিষ্ট সময় পরপর বাজারের মুরগির মাংস, ডিম ও মাছ থেকে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা নিয়ে ক্রোমিয়াম, সীসা, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকসহ প্রাসঙ্গিক দূষক পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফল জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা উচিত।
পঞ্চমত, ক্রোমিয়াম পৃথক করে যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়, তা পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে—এ বিষয়ে আলাদা নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা
সাভারের ট্যানারি বর্জ্য থেকে শিল্পের কাঁচামাল তৈরি এবং বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এটি একদিকে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার চাপ কমাতে পারে, অন্যদিকে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে ট্যানারি বর্জ্য পশুখাদ্যে ব্যবহারের অতীত সমস্যা বিবেচনায় এ উদ্যোগ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত উপকার নিশ্চিত করতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপ পরীক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—ট্যানারি বর্জ্যের একটি দূষণপথ বন্ধ হওয়া মানেই মুরগি, ডিম ও মাছের সব দূষণ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশুখাদ্যের সব উপাদান, খামারের পানি, পরিবেশ এবং বাজারজাত খাদ্য নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার এই উদ্যোগ তখনই সত্যিকার সাফল্য পাবে, যখন রপ্তানির আয় ও শিল্পের সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত প্রতিবেদন, ট্যানারি বর্জ্যে ক্রোমিয়াম ও পশুখাদ্য নিয়ে গবেষণা, ট্যানারি বর্জ্য ও পশুখাদ্য নিয়ে ২০২৪ সালের গবেষণা, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মুরগির খাদ্য ও মাংসে ভারী ধাতু নিয়ে গবেষণা, মুরগির খাদ্য, মাংস ও ডিমের সাম্প্রতিক গবেষণা, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ




