Homeনাগরিক দর্পণক্ষমতার দম্ভ থেকে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি: গাজী গোলাম মোস্তফার উত্থান, পতন ও অমীমাংসিত...

ক্ষমতার দম্ভ থেকে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি: গাজী গোলাম মোস্তফার উত্থান, পতন ও অমীমাংসিত পরিণতি

লেডিস ক্লাবের সেই বিয়ে, সেনাবাহিনীর ক্ষোভ এবং কীভাবে একটি ব্যক্তিগত অহংকার ডেকে এনেছিল ৭৫-এর অন্ধকার অধ্যায়

Today TV BD অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের পর যিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন—ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবং বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফা। তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, তাঁকে অনেকেই বলতেন ‘দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি’। কিন্তু ক্ষমতার এই চরম শিখরে থাকাকালীন তাঁর কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত, অহংকার এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার কীভাবে পরোক্ষভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং পরবর্তীতে তাঁর নিজের ভাগ্যে কী ঘটেছিল—তা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

🏛️ ভূমিকা: শেখ মুজিবের পরই যিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

গাজী গোলাম মোস্তফা কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পারিবারিক বন্ধু। এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদে স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ রেডক্রসের (বর্তমান রেড ক্রিসেন্ট) চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি টাকার ত্রাণ সামগ্রী তাঁর হাত দিয়েই বণ্টিত হতো। ফলে একদিকে রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে অঢেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ে মিলে গাজী গোলাম মোস্তফা হয়ে উঠেছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু ক্ষমতার এই অন্ধ অহংকারই পরবর্তীতে তাঁর এবং পুরো জাতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

💍 লেডিস ক্লাবের সেই রাত: যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ধ্বংসের কাউন্টডাউন

ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি মাসকারেনহাস থেকে শুরু করে সে সময়কার সামরিক কর্মকর্তাদের বিবরণী—সবখানেই ১৯৭৪ সালের ঢাকা লেডিস ক্লাবের ঘটনাটিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘ক্যাটালিস্ট’ বা অনুঘটক হিসেবে গণ্য করা হয়।

ঘটনাটি ছিল ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে, কর্নেল রেজার বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর শরিফুল হক ডালিম এবং তাঁর স্ত্রী নিম্মি। একই অনুষ্ঠানে সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফাও। বিয়ের আসরে মেজর ডালিমের শ্যালক বাপ্পীর (যিনি কানাডা থেকে এসেছিলেন) সাথে গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেদের বসা নিয়ে তীব্র কথা-কাটাকাটি হয়। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ গোলাম মোস্তফা এই সামান্য ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন।

তিনি অনুষ্ঠানস্থল থেকেই তাঁর দলবল নিয়ে রেড ক্রিসেন্টের একটি মাইক্রোবাসে করে মেজর ডালিম, তাঁর অন্তসত্ত্বা স্ত্রী নিম্মি এবং আরও কয়েকজন অতিথিকে জোরপূর্বক অপহরণ করেন। প্রথমে তাঁদের রক্ষীবাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত তাঁদের শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।

⚔️ ব্যক্তিগত বিরোধ যেভাবে রাষ্ট্রীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিলো

ডালিমকে অপহরণের খবর সেনানিবাসে পৌঁছানো মাত্রই চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। বেঙ্গল ল্যান্সার্সের ক্ষুব্ধ সেনা কর্মকর্তারা তৎকালীন সেনাপ্রধানকে না জানিয়েই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও ট্যাংক নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ি ঘেরাও করে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ফেলে। পুরো ঢাকা শহরে চেকপোস্ট বসানো হয়।

শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে মধ্যস্থতা করে সেনাপ্রধানের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। গাজী গোলাম মোস্তফা ডালিমের স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ ছিল না। এই ঘটনার কিছুদিন পর, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মেজর ডালিমসহ ল্যান্সার্সের বেশ কয়েকজন দক্ষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

এই সিদ্ধান্তটি তরুণ সেনা অফিসারদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। তারা ধরে নেয়, একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রভাবশালী নেতার অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণে রাষ্ট্র তাদের পুরস্কৃত করার বদলে শাস্তি দিয়েছে। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতাই মেজর ডালিম, মেজর ফারুক এবং মেজর শাহরিয়ারদের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করে।

🌾 কম্বল কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির ক্ষত

৭৫-এর পটভূমির পেছনে গাজী গোলাম মোস্তফার আরেকটি বড় ভূমিকা ছিল সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করা। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় বিদেশ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ কম্বল, শিশুখাদ্য এবং রিলিফ সামগ্রী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি ও পাচারের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। তৎকালীন সময়ে জনমুখে প্রচলিত ‘সবাই পায় কম্বল, আমি পাই দম্বল’—এই ক্ষোভের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। তাঁর এই সীমাহীন দুর্নীতি মওলানা ভাসানীসহ তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যা বঙ্গবন্ধুর সরকারের জনপ্রিয়তা ও নৈতিক ভিত্তিকে সাধারণ মানুষের চোখে দুর্বল করে দিয়েছিল।

🏜️ পতন ও শেষ পরিণতি: কারাগার থেকে ভারতের মরুভূমিতে মৃত্যু

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গাজী গোলাম মোস্তফার ক্ষমতার সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। নতুন সামরিক সরকার তাঁকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে।

  • কারাদণ্ড: জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সামরিক আইন আদালত তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার শুরু করে এবং তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
  • মুক্তি: প্রায় ৫ বছর জেল খাটার পর, ১৯৮০ সালের ২৮শে মার্চ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
  • ভারতে নির্বাসন ও মৃত্যু: মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সপরিবারে ভারতে চলে যান এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কারাগার থেকে মুক্তির এক বছর পার হতে না হতেই, ১৯৮১ সালের ১৯শে জানুয়ারি ভারতের রাজস্থানে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গাজী গোলাম মোস্তফা সপরিবারে নিহত হন।

📊 ঘটনার সারসংক্ষেপ ও ঐতিহাসিক শিক্ষা

  • প্রধান চরিত্র: গাজী গোলাম মোস্তফা (সাবেক সভাপতি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও চেয়ারম্যান, রেডক্রস)।
  • ৭৫-এর হত্যাকাণ্ডে দায়: ১৯৭৪ সালে লেডিস ক্লাবে মেজর ডালিম ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ এবং পরবর্তীতে সামরিক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করার পেছনে প্রধান ভূমিকা, যা সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে তীব্র প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
  • দুর্নীতির খতিয়ান: ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ত্রাণ ও কম্বল কেলেঙ্কারির খলনায়ক, যা সরকারের ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে।
  • আইনি পরিণতি: ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে সামরিক আদালতে ১০ বছরের কারাদণ্ড।
  • জীবনাবসান: ১৯৮১ সালের ১৯শে জানুয়ারি, ভারতের রাজস্থানে সপরিবারে সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু।

🌍 শেষ কথা:
ইতিহাসের পাতায় গাজী গোলাম মোস্তফার গল্পটি একটি চরম সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের অহংকার ও ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়, তখন তার মাশুল শুধু সেই ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো রাষ্ট্র ও জাতিকে দিতে হয়। লেডিস ক্লাবের সেই সামান্য পারিবারিক অহংকারের রেশ ধরে ডালিমদের চাকরিচ্যুতি যদি না ঘটতো, তবে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments