ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে দাঁতভাঙা আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ—নিরাপদ খাদ্যের দাবি আজ এক সাবেক সচিবের কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই একাকী প্রচেষ্টা কি কোনো বড় নাগরিক আন্দোলনের বীজ হয়ে উঠতে পারে?
মাহবুব কবির মিলন
সাবেক অতিরিক্ত সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
ঢাকা | ১৫ জুন ২০২৬
প্রেক্ষাপট ও মূল প্রশ্ন
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন তাঁর এক ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, চারজন নিকটাত্মীয় ক্যানসারে হারানো এবং আরেকজনের সম্প্রতি ক্যানসার ধরা পড়ার ব্যক্তিগত বেদনাই তাঁকে একটি কাঠামোবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য করেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন সাবেক আমলা নিজেই যখন বলেন—“খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম বাধা সরকারি কর্মকর্তারা”—তাহলে এই ব্যবস্থার ভেতর থেকে পরিবর্তন আনা কতটা সম্ভব? এবং একটি ‘নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন’ কীভাবে শুরু হতে পারে?
তথ্য ও উপাত্তের আলোকে: সংকটের গভীরতা
মাহবুব কবির মিলন তাঁর পোস্টে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন, যার পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা।
ক্যানসার ও কিডনি রোগের বাস্তব চিত্র
তিনি উল্লেখ করেন, “এদেশে ক্যানসার আর কিডনি রোগীর সংখ্যা বিশ্বের তাবৎ দেশের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি”—এটি অনুমান নয় বরং পরিসংখ্যানে প্রমাণিত বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন ক্যানসারে মারা গেছেন — যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশ। মাত্র চার বছরে নতুন রোগী বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
ডায়াবেটিসের চিত্র
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন মাত্র ১৮ লাখ। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা পৌঁছেছে ১ কোটি ৩৯ লাখে — অর্থাৎ প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি। একই বছরে ডায়াবেটিস-সম্পর্কিত কারণে মারা গেছেন আনুমানিক ৩১ হাজার ৬১৯ জন।
যদিও ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের সব কারণ খাদ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যে কীটনাশক, ভারী ধাতু, দূষিত পানি, অতিরিক্ত চিনি এবং পরিবেশগত দূষণকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।
বিএসটিআইয়ের পানির খসড়া মান
মাহবুব কবির মিলন তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, পানযোগ্য পানির (Potable Water) জন্য বিএসটিআই প্রথমবারের মতো ‘সম্ভাব্য সব নিরাপদ প্যারামিটার’ যুক্ত করার চেষ্টা করছে, যা তিনি স্বাগত জানান।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, পিএফএএস (PFAS), কৃষিনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক এখনো সেই মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্ত নয়। তাঁর মতে, এটি এখনো “অর্ধেক পথ” অতিক্রম করেছে মাত্র।
তথ্য অধিকার আইনে জবাব
তিনি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA) এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয়েছে।
এর মধ্যে মাত্র দুটি দপ্তর থেকে জবাব পাওয়া গেছে, বাকিগুলোর জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, এই জবাবগুলোই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ খাদ্যের পক্ষে না বিপক্ষে অবস্থান করছে।
সংকটের পরিসংখ্যান: এক নজরে
| সূচক | তথ্য |
|---|---|
| নতুন ক্যানসার রোগী (২০২২) | ১,৬৭,২৫৬ জন |
| ক্যানসারে মৃত্যু (২০২২) | ১,১৬,৫৯৮ জন |
| ক্যানসারে মৃত্যুর হার | মোট মৃত্যুর প্রায় ১২% |
| ৪ বছরে নতুন রোগী বৃদ্ধি | প্রায় ১১% |
| ডায়াবেটিস রোগী (২০০০) | ১৮ লাখ |
| ডায়াবেটিস রোগী (২০২৪) | ১ কোটি ৩৯ লাখ |
| ২০৫০-এ প্রক্ষেপণ | ২ কোটি ৩১ লাখ |
| ডায়াবেটিসজনিত মৃত্যু (২০২৪) | প্রায় ৩১,৬১৯ জন |
সূত্র: IARC, International Diabetes Federation (IDF), ICDDR,B, DGHS
ভিন্নমত ও বিতর্ক
“বাংলাদেশে BFSA আছে, আইন আছে — কাজ চলছে”
বাংলাদেশে বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA) ২০১৫ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বিভিন্ন সময়ে বাজারে কীটনাশক মেশানো শাকসবজি, ফরমালিনে ভেজানো মাছ এবং অনিরাপদ পানি বিক্রির অভিযোগও উঠে এসেছে। ফলে আইন থাকা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন এক নয়—এমন প্রশ্নও রয়েছে।
“একজন সাবেক সচিব কী করতে পারেন?”
মাহবুব কবির মিলন নিজেই উল্লেখ করেন, তিনি বিদেশে যেতে পারতেন, তবে যাননি। তিনি বলেন, তিনি গালাগালির পরিবর্তে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, একক প্রচেষ্টা কি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম?
“বিএসটিআইয়ের উদ্যোগ কি অগ্রগতি নয়?”
তিনি এটিকে অগ্রগতি হিসেবে স্বীকার করলেও উল্লেখ করেন, পূর্বে নিরাপত্তা প্যারামিটার খুব সীমিত ছিল। তবে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি উপাদান অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
নাগরিক জীবনে প্রভাব
প্রতিদিনের বাজারে
সাধারণ ভোক্তার কাছে খাদ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রায় অনুপস্থিত। লেবেলিং ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থাও সীমিত।
স্কুলের খাবারে
শিশুদের খাদ্য সরবরাহে নিয়মিত পরীক্ষার ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বোতলজাত পানিতে
অনেক ক্ষেত্রে বোতলজাত পানির মান নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
মাহবুব কবির মিলনের মতে, নিরাপদ খাদ্য এখন শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিত্র
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং এর ফল সময়ই বলে দেবে।
তিনি তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন—
| সম্ভাবনা | বর্ণনা |
|---|---|
| ইতিবাচক | সরকার ইতিবাচক সাড়া দেয়, বিএসটিআই ও BFSA-তে সংস্কার হয় |
| নিরুৎসাহিত | স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে |
| গণজাগরণ | সাধারণ মানুষ ও সংগঠনগুলো আন্দোলনে যুক্ত হয় |
তথ্য বনাম মতামত
যা নিশ্চিত তথ্য: ক্যানসার ও ডায়াবেটিস সম্পর্কিত পরিসংখ্যান IARC, IDF, DGHS ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে রয়েছে।
যা ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর মন্তব্য।
যা এখনো যাচাইয়ের অপেক্ষায়: তথ্য অধিকার আইনের আওতায় চাওয়া কিছু দপ্তরের জবাব।
শেষ কথা
মাহবুব কবির মিলন উল্লেখ করেন, তাঁর পরিবারে একের পর এক ক্যানসারের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, তাঁর যুদ্ধ চলবে। তবে প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধে কতজন নাগরিক, শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও সৎ ব্যবসায়ী যুক্ত হবেন?
একজন নিঃসঙ্গ সাবেক সচিবের এই আহ্বান যদি নিঃসঙ্গই থেকে যায়, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সন্তানদের মুক্তির সব পথ বন্ধ”—এই বাস্তবতা যদি সত্য হয়, তবে এখনই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
লেখক পরিচিতি: মাহবুব কবির মিলন বাংলাদেশের একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব। খাদ্য নিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশ করে আসছেন।



