Homeশোবিজ টুডেরুপালি পর্দা থেকে সংসার—নায়করাজের আবিষ্কার কাজরীর জীবনের সেই বিস্ময়কর গল্প

রুপালি পর্দা থেকে সংসার—নায়করাজের আবিষ্কার কাজরীর জীবনের সেই বিস্ময়কর গল্প

আশির দশকের চঞ্চলা-চপলা রূপবতী নায়িকা, ‘নয়নের আলো’র অনন্য সাফল্য, প্রেমের টানে চলচ্চিত্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী জীবনের নানা বাঁক

শোবিজ টুডে ডেস্ক

আশির দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায় একসময় যে কজন অভিনেত্রীকে ঘিরে দর্শকের কৌতূহল, মুগ্ধতা আর স্বপ্ন একসঙ্গে কাজ করত, কাজরী ছিলেন তাঁদেরই একজন। চঞ্চল, প্রাণবন্ত, রূপবতী—চেহারায় ছিল আলাদা এক আকর্ষণ, অভিনয়ে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। বড় নায়িকাদের ভিড়েও নিজের জন্য আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।

তাঁর পুরো নাম ফেরদৌস আরা মাহমুদ শেলি। ‘মাহমুদ’ ছিল তাঁর বাবার পদবি। বাবা ইয়ার মাহমুদ। ভাইয়ের নাম ফিরোজ মাহমুদ। চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে বেড়ে ওঠা কাজরীর চলচ্চিত্রজীবন খুব দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু অল্প সময়েই তিনি এমন কিছু কাজ রেখে গেছেন, যেগুলো এখনও পুরোনো দিনের বাংলা সিনেমার দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

আর তাঁর ব্যক্তিজীবনের গল্পটিও কম নাটকীয় নয়। প্রেম, বিয়ে, চলচ্চিত্র ছাড়ার শর্ত, ‘নয়নের আলো’ নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে কাজরীর জীবন যেন আশির দশকের বাংলা সিনেমারই আরেকটি গল্প।

নায়করাজের চোখে আবিষ্কৃত এক সম্ভাবনাময় মুখ

চলচ্চিত্রে আসার পর দ্বিতীয় নায়িকা হিসেবে দ্রুতই পরিচিতি পেতে শুরু করেন কাজরী। **‘সুখ দুঃখের সাথী’, ‘রেশমি চুড়ি’, ‘কেউ কারো নয়’, ‘ঈদ মোবারক’, ‘কাজল লতা’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘মহানায়ক’**সহ একাধিক ছবিতে শাবানা, ববিতা, রোজিনা, সুচরিতা, নূতন, অঞ্জনা প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি।

এই জায়গাতেই নায়করাজ রাজ্জাকের দৃষ্টির কথা বিশেষভাবে সামনে আসে। বলা হয়, রাজ্জাক কাজরীর মধ্যে অন্যরকম সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। অভিজ্ঞ জহুরির মতোই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই তরুণ অভিনেত্রীর মধ্যে শুধু সৌন্দর্য নয়, পর্দায় নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতাও আছে।

রাজ্জাক তাঁর ‘জোকার’ ছবিতে কাজরীকে একক নায়িকা হিসেবে কাস্ট করেন। পরে ‘মৌচোর’ ছবিতেও তিনি রাজ্জাকের নায়িকা হন।

কাজরীকে চলচ্চিত্রে বড় সুযোগ দেওয়ার পেছনে রাজ্জাকের ব্যক্তিগত পছন্দ ও পেশাগত বিচক্ষণতার কথা চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের স্মৃতিচারণে আসে। কবরীর সঙ্গে নায়করাজের সম্পর্ক একসময় তিক্ত হয়ে উঠেছিল—এমন কথাও চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রচলিত ছিল। সেই সময় কাজরীকে সামনে নিয়ে আসার ঘটনাটিকে কেউ কেউ ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর জন্য বড় দরজা খুলে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে দেখেন।

রূপের মুগ্ধতা, সম্ভাবনার আলো

কাজরীর সৌন্দর্য ছিল তাঁর অন্যতম বড় পরিচয়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দর্শকের দৃষ্টি কাড়ত। রূপমুগ্ধ গুণগ্রাহীরও কমতি ছিল না। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট মহলে এমন কথাও প্রচলিত ছিল যে, তাঁর সঙ্গে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর সুসম্পর্ক ছিল এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাঁর অভিনীত সিনেমা প্রযোজনায় আগ্রহ দেখাতেন।

তবে শুধু রূপের জোরে নয়, নিজের অভিনয়গুণেও তিনি দর্শকের কাছে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। বড় তারকাদের পাশে থেকেও পর্দায় হারিয়ে যেতেন না—এটাই ছিল তাঁর বড় শক্তি।

কিন্তু ঠিক যখন তাঁর ক্যারিয়ার আরও ওপরে ওঠার সময়, তখনই ব্যক্তিজীবনে এসে যায় বড় পরিবর্তন।

১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বদলে গেল জীবন

১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কাজরীর জীবনে আসে বিয়ের দিন। তাঁর স্বামী মোহাম্মদ আবুল কাসেম চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ব্যবসায় যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বলে আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ আছে।

কাজরী ও কাসেমের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। বলা হয়, কাজরীর সৌন্দর্যেই মুগ্ধ হয়ে কাসেম তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। পরে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুর উদ্যোগে গোপনে বিয়ের আয়োজনও করা হয়।

তবে এই বিয়ের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—বিয়ের পর কাজরী কি চলচ্চিত্রে থাকবেন?

শর্ত ছিল, বিয়ের পর আর চলচ্চিত্র নয়

বিয়ের আগে কাসেমের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট শর্ত ছিল—বিয়ের পর কাজরীকে চলচ্চিত্রজগত থেকে সরে আসতে হবে এবং চট্টগ্রামে বসবাস করতে হবে।

কাজরীর তখন উঠতি ক্যারিয়ার। পর্দায় পরিচিতি বাড়ছে, বড় অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করছেন, একাধিক ছবিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। ফলে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য সহজ ছিল না।

প্রথমদিকে তিনি এ বিষয়ে গড়িমসি করেছিলেন বলেও জানা যায়। কিন্তু পরিবারের আপত্তি এবং বিয়ের বাস্তবতার সামনে শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজি হতে হয়।

কথা ছিল সেদিন শুধু আংটি বদলের অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু আবুল কাসেমের আগ্রহ ও চাপের কারণে সেই অনুষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত বিয়েতে পরিণত হয়।

ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাড়িতে বসেছিল সেই বিয়ের আয়োজন। কাজরীর পক্ষ থেকে ছিলেন তাঁর মা-বাবা, খালা, মামা ও ভাইবোনেরা। অন্যদিকে পাত্রের পরিবারের উপস্থিতি ছিল খুব সীমিত। কারণ কাসেম নিজের পরিবারের অমত সত্ত্বেও কাজরীকে বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়।

কাসেমের পরিবার নাকি কোনো চলচ্চিত্র অভিনেত্রীকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে চাইছিল না। সে সময় সমাজে চলচ্চিত্রের নায়িকাদের নিয়ে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা ছিল। সেই সামাজিক মানসিকতাও এই বিরোধের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

বিয়েতে দেনমোহর ধার্য হয়েছিল ৫০ হাজার ১ টাকা, আর উসুল দেখানো হয়েছিল ২০ হাজার টাকা। কাবিননামায় কাজরীর বয়স ২০ এবং কাসেমের বয়স ৩৪ বছর দেখানো হয়েছিল।

বিয়ের পরও ‘নয়নের আলো’

চমকটা এখানেই।

বিয়ের পর চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও কাজরী হঠাৎই জাফর ইকবালের বিপরীতে ‘নয়নের আলো’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

পরিবারে তখন রীতিমতো ঝড় ওঠে।

ঘনিষ্ঠ একজনের ব্যাখ্যা ছিল—ববিতার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার ব্যাপারে কাজরীর মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। ফলে তিনি ‘নয়নের আলো’ করার সিদ্ধান্ত নেন।

কাজরীর এই সিদ্ধান্তে আবুল কাসেম খুবই ক্ষুব্ধ হন। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক সালিশও বসেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সেই সালিশে কাজরীর নিজের পরিবারের সদস্যরাও কাসেমের পক্ষ নিয়েছিলেন এবং তাঁকে চলচ্চিত্রে ফেরার সিদ্ধান্তের জন্য তিরস্কার করেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত কাজরী কোন পথ বেছে নিলেন, সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের বড় মোড়।

‘নয়নের আলো’ হয়ে রইল মাইলফলক

কাজরীর চলচ্চিত্রজীবনের কথা উঠলে ‘নয়নের আলো’ আলাদা করে উচ্চারিত হয়। এই ছবিই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো—যে সময় তাঁর চলচ্চিত্রজীবন থেমে যাওয়ার কথা ছিল, সেই সময়েই তিনি এমন একটি ছবিতে অভিনয় করলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ, জীবনের যে সিদ্ধান্তটি ছিল সবচেয়ে কঠিন, সেখানেই আবার তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি তৈরি হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সংসারই হলো প্রধান ঠিকানা

পরবর্তীতে কাজরী স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় স্থায়ী হন। সংসার, সন্তান এবং ব্যক্তিজীবনই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান জগৎ।

তাঁর ছেলে সাকি বড় হতে থাকেন। একসময় নিকুঞ্জে কাজরীর ফ্ল্যাট ছিল। সেখানে প্রতিবেশী হিসেবে ছিলেন অভিনেত্রী বুবলী।

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বড় হয়ে সাকির সঙ্গে বুবলীর পরিচয় এবং পরে সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে সাকি তাঁর মা কাজরীর কাছে বুবলীকে বিয়ে করার ইচ্ছার কথা জানান। কিন্তু কাজরী ও তাঁর স্বামী এই সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি বলে বর্ণনা রয়েছে। পরিবারের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থানের পার্থক্য তাঁদের আপত্তির অন্যতম কারণ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আপত্তিকে গুরুত্ব দেননি সাকি। দুজন গোপনে বিয়েও করেন। যদিও সেই দাম্পত্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; পরবর্তীতে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

রুপালি পর্দার ক্ষণস্থায়ী নায়িকা, দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি

কাজরীর চলচ্চিত্রজীবন দীর্ঘ নয়। তিনি অসংখ্য ছবিতে অভিনয়ও করেননি। কিন্তু একটা সময়ের বাংলা সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি, তাঁর রূপ, তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি এবং নায়করাজ রাজ্জাকের দেওয়া সুযোগ তাঁকে আলাদা করে মনে রাখার মতো একটি চরিত্রে পরিণত করেছে।

‘কাজল লতা’, ‘সুখ দুঃখের সাথী’, ‘মহানায়ক’, ‘রেশমি চুড়ি’, ‘কেউ কারো নয়’—এসব ছবির নাম উচ্চারণ করলেই আশির দশকের সেই চলচ্চিত্র-জগতের একটি ছবি ভেসে ওঠে। আর ‘নয়নের আলো’ তাঁকে সেই স্মৃতিতে আরও স্থায়ী করে দিয়েছে।

একদিকে ছিল রুপালি পর্দার ঝলমলে জীবন, অন্যদিকে সংসারের বাস্তবতা। একদিকে ছিল অভিনয়ের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ভালোবাসা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত এবং জীবনের নতুন দায়।

কাজরীর গল্প তাই শুধু একজন নায়িকার গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন একজন নারীর ব্যক্তিজীবনের সিদ্ধান্ত প্রায়শই তাঁর পেশাজীবনের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিত।

আশির দশকের সেই চঞ্চলা, চপলা, অপরূপ সুন্দরী অভিনেত্রী আজ হয়তো আর রুপালি পর্দায় নেই। কিন্তু পুরোনো বাংলা সিনেমার দর্শকের স্মৃতিতে কাজরী এখনও একটি পরিচিত মুখ—যে মুখের গল্প অল্প দিনের, কিন্তু যার রেশ দীর্ঘদিনের।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments