Homeশোবিজ টুডেচাঁদা না দেওয়ার অভিযোগ, ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর

চাঁদা না দেওয়ার অভিযোগ, ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর

রাতের হামলায় ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ; পুলিশ বলছে জমি দখলকেন্দ্রিক বিরোধ, সালমানের বক্তব্য—চাঁদার দাবি ছিল প্রকল্পের মালিকের কাছে

ঢাকা | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের মাতিকাটা এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে শনিবার রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। স্টুডিওটি যে আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত, সেখানে চাঁদার টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। পুলিশ অবশ্য ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে জমি দখলকেন্দ্রিক বিরোধ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল ওই ভবনে ঢুকে স্টুডিওতে ভাঙচুর চালায় বলে স্টুডিওর এক কেয়ারটেকার জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা শাটার ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং যন্ত্রপাতি, আসবাবসহ বিভিন্ন সামগ্রী তছনছ করে। তাঁদের অনেকের মুখে মাস্ক ছিল এবং কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে বলেও তিনি জানান।
হামলার সময় দুই কেয়ারটেকার একটি টয়লেটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হামলাকারীরা সেখানেও গিয়ে তাঁদের হুমকি দেয় এবং মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় বলে ওই কর্মীর বক্তব্য। তবে স্টুডিওর কোনো কর্মী হামলায় আহত হননি বলে সালমান মুক্তাদির জানিয়েছেন।

স্টুডিওর ভেতরে ধ্বংসের চিহ্ন

ঘটনার পর স্টুডিওর বেশির ভাগ পেশাদার যন্ত্রপাতি, আসবাব ও সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর স্টুডিওর যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন কক্ষের সামগ্রী লুটপাট ও ভাঙচুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রাউনফিশ স্টুডিও নিজেদের ওয়েবসাইটে এটিকে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, ফটোগ্রাফি, পডকাস্ট, অনলাইন কনটেন্ট, মিউজিক প্রোডাকশনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য তৈরি একটি পেশাদার স্টুডিও হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্টুডিওটির আয়তন প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট এবং সেখানে ইনডোর গাড়ি শুটের জায়গা, মেকআপ রুম, ভিআইপি কক্ষ, ক্যাফেটেরিয়া ও প্রোডাকশন সুবিধা রয়েছে।
সালমান মুক্তাদিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্টুডিওতে অন্তত ২৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল, যার সবগুলোই হামলায় নষ্ট হয়েছে। স্টুডিওটি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি অংশীদারদের নিয়ে চালু করেন।

চাঁদার অভিযোগের সূত্র কোথায়

ঘটনার পর প্রথমে বিষয়টি চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত বলে সামনে আসে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, আবাসন প্রকল্পের জমির মালিকের কাছে চাঁদার দাবি করা হয়েছিল এবং তা পূরণ না হওয়ার পর হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, সালমান মুক্তাদিরের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল সম্ভবত প্রকল্পের মালিকপক্ষের সম্পত্তি এবং সেই বিরোধের মধ্যে তাঁর স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, কত টাকা দাবি করা হয়েছিল বা কারা সেই টাকা চেয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
সালমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি মনে করেছিলেন হামলাটি হয়তো তাঁকে লক্ষ্য করে হয়েছে। পরে পুরো প্রকল্পের বিভিন্ন জায়গায় হামলার চিহ্ন দেখে তাঁর ধারণা হয়, ঘটনার পেছনে প্রকল্প-সংক্রান্ত বিরোধই বড় কারণ হতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, প্রকল্পের মালিকের সঙ্গে তখনও তাঁর সরাসরি কথা হয়নি।

পুলিশের বর্ণনায় জমি দখলের বিরোধ

ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেছেন, ইসিবি এলাকায় একটি অফিসে জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে হামলা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সেখান থেকে ছুরি-সহ দুইজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
পুলিশের এই বক্তব্যে ঘটনাটির মূল কারণ হিসেবে জমি দখলের বিরোধের কথা এসেছে। অন্যদিকে প্রকাশিত সংবাদে চাঁদা দাবির অভিযোগও এসেছে। ফলে হামলার সঙ্গে জমি দখল ও চাঁদা—দুই ধরনের অভিযোগই এখন আলোচনায় রয়েছে।

হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

সালমান মুক্তাদির তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে হামলাকারীদের স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে একই ভিডিও ও পরবর্তী বক্তব্যে তিনি বলেন, তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চাঁদা চাওয়া হয়নি এবং প্রকল্পের মালিকপক্ষকে ঘিরে কোনো বিরোধ থেকেই হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।
এখন পর্যন্ত পুলিশ যে বক্তব্য প্রকাশ করেছে, সেখানে আটক দুই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশের বক্তব্যে জমি দখলকে ঘিরে বিরোধ এবং অস্ত্রসহ দুইজনকে আটকের বিষয়টিই রয়েছে।

একটি নতুন সৃজনশীল কর্মস্থল থমকে গেল

ব্রাউনফিশ স্টুডিওর ব্যবসায়িক পরিচয় থেকে বোঝা যায়, এটি কেবল একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ব্যক্তিগত শুটিং স্পেস নয়। স্টুডিওটি বিজ্ঞাপন, ফটোশুট, পডকাস্ট, চলচ্চিত্র, মিউজিক প্রোডাকশন, অনলাইন কনটেন্ট এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাজের জন্য ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে। স্টুডিওর নিজস্ব ওয়েবসাইটে ইন-হাউস প্রোডাকশন টিম ও বিভিন্ন শুটিং সুবিধার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
সালমান মুক্তাদির বলেছেন, হামলায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তখনও হিসাব করা হয়নি। তিনি জানান, তাঁর কাছে অর্থের চেয়ে কর্মীদের মানসিক অবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের কাজের মাধ্যমে তৈরি করা এই প্রতিষ্ঠান আবার গড়ে তোলার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

রাতের ঘটনার পর তদন্তে যে প্রশ্নগুলো সামনে

ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পেতে এখন কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হামলাকারীদের প্রকৃত সংখ্যা কত ছিল, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের গতিবিধি ধরা পড়েছে কি না, আটক দুই ব্যক্তির পরিচয় কী, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হচ্ছে এবং প্রকল্পের মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধের প্রকৃতি কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে সামনে আসতে পারে।
একই সঙ্গে চাঁদার দাবি হয়ে থাকলে সেটি কার কাছে করা হয়েছিল, কত টাকা চাওয়া হয়েছিল, আগে কোনো হুমকি বা চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং এর পক্ষে ফোনকল, বার্তা, অডিও, ভিডিও বা অন্য কোনো নথি রয়েছে কি না—সেসবও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাবও এখনও সামনে আসেনি। স্টুডিওর পেশাদার ক্যামেরা, আলো, অন্যান্য প্রোডাকশন সরঞ্জাম, আসবাব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নিয়মিত কাজের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইসিবি চত্বরের এই ঘটনা তাই এখন শুধু একজন পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা নয়। এটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, চাঁদার অভিযোগ, সংঘবদ্ধ হামলা এবং একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা—সবকিছুকে একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশি তদন্তে হামলার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পেছনের অর্থনৈতিক বা সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ কতটা গভীর ছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইত্তেফাক, ব্রাউনফিশ স্টুডিওর নিজস্ব ওয়েবসাইট।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments