Homeটুডে ওয়ার্ল্ডইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, আগস্টে হটস্পট ৯ হাজার ছাড়াল

ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, আগস্টে হটস্পট ৯ হাজার ছাড়াল

সুপার-এল নিনোর তাপে দ্রুত ছড়াচ্ছে আগুন; জুলাইয়ে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়েছে, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ

জাকার্তা | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ায় চলতি বছরের দাবানল পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে বোর্নিও দ্বীপের আগুনপ্রবণ পিটল্যান্ড এলাকায় একের পর এক আগুন ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের ধোঁয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে বিমান, অগ্নিনির্বাপক দল এবং cloud-seeding প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আগস্টে দেশজুড়ে শনাক্ত হওয়া অগ্নিকাণ্ডের হটস্পট ৯ হাজার ছাড়িয়েছে, যা ২০১৫ সালের আগস্টের ৫ হাজার ৭৭টির তুলনায় অনেক বেশি।

ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, চলতি বছরের শক্তিশালী El Niño সরাসরি আগুনের কারণ নয়; বরং অতিরিক্ত তাপ ও শুষ্কতা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ তৈরি করছে। একই সময়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রাও রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। Copernicus-এর তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল।

২০১৫ সালের ভয়াবহতার ছায়া এখনো সামনে

ইন্দোনেশিয়ার জন্য ২০১৫ সাল একটি বড় সতর্কতার বছর। সে বছর দাবানল ও ধোঁয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। চলতি বছরের পরিস্থিতি এখনো ২০১৫ সালের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতিতে পৌঁছায়নি, কিন্তু কয়েকটি সূচকে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

শুধু জুলাই মাসেই প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে গেছে। একই সময়ে মাসিক গড় তাপমাত্রা ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

আগস্টে আগুনের হটস্পট ৯ হাজারের বেশি হলেও ২০১৫ সালের অক্টোবরে এক মাসে যে ১৭,৩০২টি হটস্পট শনাক্ত হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো তার নিচে রয়েছে।

কার্বন নিঃসরণও দ্রুত বাড়ছে

আগুনের পরিবেশগত প্রভাব শুধু পুড়ে যাওয়া বনভূমিতে সীমাবদ্ধ নয়। Copernicus Fire Emissions Watch-এর হিসাবে, গত সাত দিনে ইন্দোনেশিয়ার দাবানল থেকে প্রায় ১৭.১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। এটি মৌসুমি গড়ের চেয়ে ৪২৯ শতাংশ বেশি

ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় বায়ু দূষণও বাড়ছে। বিশেষ করে বোর্নিও ও আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ধোঁয়া থাকলে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং বিমান ও নৌ চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু আবহাওয়া নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডও বড় কারণ

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের পেছনে শুধু El Niño দায়ী নয়। কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে জমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহার দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। বন উজাড়ের ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় আগুন দ্রুত ছড়ানোর পরিবেশ তৈরি হয়।

বোর্নিওর পিটল্যান্ডে সমস্যা আরও জটিল। মাটির নিচে থাকা পিটে আগুন দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে জ্বলতে পারে, ফলে একবার আগুন লাগলে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়।

সরকার এবার আগেভাগেই আগুন ঠেকাতে চাইছে

ইন্দোনেশিয়া আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ারফাইটিং বিমান এবং cloud-seeding পরিচালনা করছে। পাশাপাশি দক্ষিণ সুমাত্রা ও কালিমানতানে আগুনের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৯টি কোম্পানির কার্যক্রমও পরিদর্শন করছে সরকার। পরিবেশ ও বন ব্যবস্থাপনায় আইন ভাঙার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

২০১৫ সালের বিপর্যয়ের পর ইন্দোনেশিয়া আগুন নেভানোর পাশাপাশি আগুনের উৎস প্রতিরোধ, পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধার এবং অবৈধ জমি পরিষ্কারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ বর্তমান ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউরোপ থেকেও আসছে একই ধরনের সতর্ক সংকেত

ইন্দোনেশিয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছরে উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে শুষ্কতা ও দাবানল বেড়েছে। ইউরোপে এ বছর এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৮০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি দাবানলে পুড়েছে বলে EU-এর তথ্য জানিয়েছে।

অর্থাৎ দাবানলের ঝুঁকি এখন শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘ খরা ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার সমন্বয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের ঝুঁকি বাড়ছে।

📊 ইন্দোনেশিয়ার আগুনের কয়েকটি সংখ্যা

• আগস্টের হটস্পট: ৯,০০০+
• জুলাইয়ে পুড়ে যাওয়া এলাকা: প্রায় ৯৫,০০০ হেক্টর
• গত সাত দিনে কার্বন নিঃসরণ: ১৭.১ মিলিয়ন টন
• মৌসুমি গড়ের তুলনায় নিঃসরণ: +৪২৯%
• ২২ আগস্ট বিশ্ব সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা: ২১.১°C

🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় দাবানল ও দীর্ঘস্থায়ী ধোঁয়া আঞ্চলিক বায়ুমান ও আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি স্বাস্থ্য বা আবহাওয়াগত প্রভাব পড়ছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর মতো বৃহৎ আবহাওয়াগত প্রবণতা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইন্দোনেশিয়ার পরিস্থিতি এ অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।

🧭 এরপর কী

আগামী কয়েক সপ্তাহে বৃষ্টি না এলে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। এখন মূল নজর থাকবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, হটস্পটের সংখ্যা এবং সরকার আগুন নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল হচ্ছে তার ওপর।

📌 তথ্যসূত্র

Reuters, Copernicus Climate Change Service, Copernicus Fire Emissions Watch, Indonesia disaster authorities।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments