হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ড্রিল ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ; ভারত-চীনের বিশেষজ্ঞরা সহায়তায়
কাঠমান্ডু | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপালের হিমালয় অঞ্চলে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যা ও কাদাধসের পর উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। নেপাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশটির রাশুয়া ও নুওয়াকোট জেলার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে, যেখানে ৯৩৩ শ্রমিকের নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চীনের পক্ষ থেকে গিরং কাউন্টিতে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
টানেলের ভেতরে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দলগুলো আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ, খননযন্ত্র ও সার্চলাইট ব্যবহার করছে। দুটি টানেলে প্রবেশের পর তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগ অংশ এখনও কাদা ও ধ্বংসাবশেষে আটকে আছে।
বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর জমে থাকায় টানেলে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট বলেছেন, প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত টানেলের প্রবেশপথ খুলে ফেলা।
AP-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতের একটি সংগঠনের হিসাবে প্রায় ৯০০ শ্রমিক ১২টি ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পে নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন টানেলের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্যোগে শুধু মানুষ নয়, বিদ্যুৎ অবকাঠামোও বিপর্যস্ত
নেপাল গত কয়েক দশকে পাহাড়ি নদী ব্যবহার করে দ্রুত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়িয়েছে। এসব প্রকল্পে নদীর পানি পরিচালনার জন্য দীর্ঘ টানেল নির্মাণ করা হয়। বন্যার ধ্বংসাবশেষ সেই টানেলগুলোতে ঢুকে যাওয়ায় উদ্ধার আরও কঠিন হয়েছে।
দুর্যোগের ফলে সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকারী দলকে অনেক জায়গায় ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা পেরিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হচ্ছে। ফলে উদ্ধার অভিযান একই সঙ্গে সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারত ও চীন থেকে বিশেষজ্ঞ সহায়তা
নেপাল সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বড় পরিসরে বিদেশি সহায়তা চায়নি। তবে বিশেষায়িত টানেল উদ্ধার কাজে ভারত ও চীনের সহায়তা নিয়েছে। চীন নয়জন টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞ নেপালে পাঠিয়েছে এবং স্যাটেলাইট তথ্যও শেয়ার করছে।
চীন জানিয়েছে, তাদের দেশে সীমান্তের ওপারে ২৬১ বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রায় ৩৯ দেশের ৫৯০ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন।
আরও ধস ও নতুন বন্যার আশঙ্কা কাটেনি
উদ্ধার অভিযান চলার মাঝেও ঝুঁকি শেষ হয়নি। ধসের পর তৈরি হওয়া হ্রদ, নতুন ভূমিধস এবং পাহাড়ি বরফের অস্থিতিশীলতা আবারও আকস্মিক বন্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধসের উৎসের আশপাশে নতুন করে বরফধসের ঝুঁকি রয়েছে।
চীন এই দুর্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও হিমবাহ অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে নির্দিষ্ট একটি দুর্যোগের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা, তা নির্ধারণ করতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
চলছে গণদাফন ও মরদেহ শনাক্তকরণের কঠিন কাজ
বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া বহু মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর্দ্র আবহাওয়ায় দ্রুত পচন শুরু হওয়ায় নেপালের কিছু এলাকায় শনাক্তহীন মরদেহের গণদাফন শুরু হয়েছে এবং পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
📊 দুর্যোগের বর্তমান চিত্র
| সূচক | সর্বশেষ তথ্য |
|---|---|
| নেপালে নিশ্চিত মৃত্যু | ৯০৩ |
| নেপালে নিখোঁজ | ৪,২৪৭ |
| জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ শ্রমিক | ৯৩৩ |
| চীনের তিব্বতে মৃত্যু | ১৬ |
| তিব্বতে নিখোঁজ | ৫৪৬ |
| সম্ভাব্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ | ৯০,০০০+ |
🧭 সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
উদ্ধারকারী দলগুলো এখন আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে নতুন কোনো ধস বা জলাধার ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
📌 তথ্যসূত্র
Reuters, Associated Press, Al Jazeera, Nepal disaster authorities, Nepal Army।




