লরাক দ্বীপে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা; তেলের দাম বেড়ে ৯০ ডলারের ওপরে
ওয়াশিংটন/তেহরান | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সরাসরি সামরিক হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের লরাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীকে লক্ষ্য করেই ‘সীমিত ও নির্ভুল’ অভিযান চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস বলেছে, মার্কিন হামলায় কয়েকজন সৈন্য ও বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও আহত হয়েছেন এবং এর জবাব দেওয়া হবে। ইরানও পাল্টা হামলায় জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে; জর্ডানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আকাশসীমায় ঢোকা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিই এখন সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা
লরাক দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখের কাছে এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামুদ্রিক যোগাযোগের খুব কাছে অবস্থিত। ফলে এই এলাকায় সামরিক কর্মকাণ্ড বাড়লে শুধু দুই দেশের সংঘাতই নয়, আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়ে।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান যেত। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় দৃশ্যমান বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন মাত্র প্রায় পাঁচটি দৃশ্যমান কমোডিটি জাহাজ চলাচল করেছে, যদিও কিছু জাহাজ নিরাপত্তার কারণে তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে থাকতে পারে।
খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি, কিন্তু প্রমাণ মেলেনি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ ব্যাপক হামলার শিকার হচ্ছে। তবে Reuters জানিয়েছে, তার পোস্টের সঙ্গে থাকা বিস্ফোরণের ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং খার্গ দ্বীপে হামলার দাবির পক্ষে অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
Reuters-এর প্রযুক্তিগত যাচাইয়ে ভিডিওটি সম্ভবত AI-generated বলে উঠে এসেছে। একই সময়ে হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও খার্গে হামলার বিষয়ে বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি। ফলে এ দাবিকে এখনো যাচাইকৃত সামরিক ঘটনা হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বাজারে প্রথম ধাক্কা
সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সোমবার Brent crude প্রতি ব্যারেল ৯০.৩৪ ডলারে উঠে প্রায় ২.৫৪ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের WTI অপরিশোধিত তেলও বেড়ে ৮৫.৫১ ডলার হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে তখনই, যখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হয়।
অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামরিক চাপও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
মার্কিন প্রশাসন শুধু সামরিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের ওপর প্রতি সপ্তাহে নতুন করে secondary sanctions আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যাংক ও ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ তেহরানের ওপর একই সঙ্গে সামরিক, আর্থিক ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়ছে। এর ফলে সংঘাতের পরবর্তী পর্যায় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও জ্বালানি বাণিজ্যেও নির্ধারিত হতে পারে।
📊 সংঘাতের তাৎক্ষণিক চিত্র
• Brent crude: $90.34/ব্যারেল
• WTI crude: $85.51/ব্যারেল
• হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল: দৃশ্যমানভাবে তীব্রভাবে কমেছে
• মার্কিন হামলা: লরাক দ্বীপের দুটি লঞ্চার
• ইরানের পাল্টা হামলা: জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটি
🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি তেলের দাম দেশের আমদানি ব্যয়েও চাপ তৈরি করতে পারে। জ্বালানি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কাঁচামালের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পরে মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।
তবে এখনই বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কতটা প্রভাব পড়বে তা বলা যাচ্ছে না। সেটি নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।
🧭 এরপর কী
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়া, হরমুজে জাহাজ চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা। পরিস্থিতি যদি সীমিত সামরিক পাল্টাপাল্টির মধ্যে থাকে, তাহলে বাজারের চাপ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। কিন্তু সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা বাড়বে।
📌 তথ্যসূত্র
Reuters, U.S. Central Command, Iranian state media, Jordanian authorities।




