Homeটুডে স্পোর্টসজিনেদিন জিদান — মার্সেইর অভিবাসী পাড়ার ছেলেটি কীভাবে ফুটবলের নীরব সম্রাট হয়ে...

জিনেদিন জিদান — মার্সেইর অভিবাসী পাড়ার ছেলেটি কীভাবে ফুটবলের নীরব সম্রাট হয়ে উঠলেন

সর্বকালের সেরা ১০ ফুটবলার সিরিজ – পর্ব 

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা গতি দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করেন, কেউ করেন শক্তি দিয়ে, কেউ করেন গোলের বন্যা বইয়ে। আর কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা বল স্পর্শ করলেই ফুটবল অন্য এক শিল্পে পরিণত হয়। জিনেদিন জিদান ছিলেন তেমনই একজন।

তাঁর পায়ের নিচে ফুটবল যেন কখনো বল ছিল না; ছিল এক নীরব কবিতা।

ফ্রান্সের মার্সেই শহরের অভিবাসী অধ্যুষিত এক সাধারণ পাড়া থেকে উঠে আসা ছেলেটি পরে হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, ইউরোপের রাজা, এবং ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় শিল্পী। অথচ তাঁর গল্পের শুরুটা ছিল না রাজকীয়—ছিল সংগ্রাম, পরিচয়ের সংকট এবং নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই।


শৈশব: মার্সেইর রুক্ষ পাড়ায় বেড়ে ওঠা

জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের জন্ম ২৩ জুন ১৯৭২ সালে ফ্রান্সের মার্সেই শহরে।

তাঁর বাবা-মা ছিলেন আলজেরিয়ার কাবাইল বংশোদ্ভূত অভিবাসী। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আলজেরিয়া ছেড়ে তাঁরা ফ্রান্সে চলে আসেন।

জিদানের পরিবার বসবাস করত La Castellane নামের একটি শ্রমজীবী এলাকায়।

এটি ছিল এমন একটি এলাকা, যেখানে অপরাধ, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা।

পরবর্তীতে জিদান বলেছিলেন—

“ফুটবল আমাকে রাস্তা থেকে বাঁচিয়েছে।”

ছোটবেলায় তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ফুটবল খেলতেন।

তিনি ছিলেন শান্ত, কম কথা বলা ছেলে।

কিন্তু বল পায়ে পেলেই যেন বদলে যেতেন।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই পরিবার বুঝে যায়—এই শিশুর মধ্যে কিছু আলাদা আছে।


প্রথম ক্লাব: ছোট শহর থেকে বড় স্বপ্ন

প্রথমে স্থানীয় ক্লাব US Saint-Henri-তে খেলেন।

পরে যোগ দেন SO Septèmes-les-Vallons-এ।

সেখানেই প্রথম তাঁর প্রতিভা বড় স্কাউটদের নজরে পড়ে।

১৪ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি Cannes-এ।

সেখানেই প্রথমবার পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়।

রাতের বেলা মায়ের জন্য কাঁদতেন তিনি।

নিজের চারপাশে অচেনা মানুষ, অচেনা শহর।

কিন্তু ফুটবল ছিল তাঁর একমাত্র সঙ্গী।


প্রথম পেশাদার জীবন: কান থেকে বোর্দো

পেশাদার অভিষেক

  • ক্লাব: Cannes
  • বছর: ১৯৮৯
  • বয়স: ১৭

১৯৯১ সালে প্রথম সিনিয়র গোল করেন।

ক্লাব সভাপতি তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—

“প্রথম গোল করলে একটি গাড়ি দেব।”

গোলের পর সত্যিই তিনি গাড়ি পান।

এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় পুরস্কার।

পরে তিনি যোগ দেন Bordeaux-এ।

সেখানে তাঁর সঙ্গে খেলতেন—

• ক্রিস্টোফ দুগারি
• বিক্সেন্টে লিজারাজু

সেই সময়ই ইউরোপ বুঝতে শুরু করে—একজন অসাধারণ মিডফিল্ডার জন্ম নিচ্ছে।


জুভেন্টাস: ইউরোপের নতুন সম্রাট

১৯৯৬ সালে জিদান ইতালির Juventus-এ যোগ দেন।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক বিস্ফোরণ।

জুভেন্টাসের হয়ে:

• ম্যাচ: ২১২
• গোল: ৩১

জিতেছেন—

  • ২টি সিরি আ
  • ১টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ
  • ১টি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ

ইতালিতে তিনি শিখেছিলেন—

কীভাবে প্রতিভার সঙ্গে কৌশল ও শৃঙ্খলা মেলাতে হয়।


জাতীয় দলের শুরু: ধীরে ধীরে নায়ক হয়ে ওঠা

ফ্রান্স অভিষেক

  • তারিখ: ১৭ আগস্ট ১৯৯৪
  • প্রতিপক্ষ: চেক প্রজাতন্ত্র

মজার বিষয়—

বদলি হিসেবে নেমে তিনি দুটি গোল করেছিলেন।

ফ্রান্স ০–২ পিছিয়ে ছিল।

জিদানের গোলেই ম্যাচ ড্র হয়।

সেদিনই ফ্রান্স বুঝেছিল—নতুন এক নেতা এসেছে।


বিশ্বকাপ অধ্যায়–১: ১৯৯৮ — ফ্রান্সের রাজা

নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ।

ফ্রান্সের কোটি মানুষের আশা।

পুরো টুর্নামেন্টে জিদান খুব বেশি গোল করেননি।

কিন্তু ফাইনালের রাত বদলে দেয় সবকিছু।

ফাইনাল

ফ্রান্স বনাম ব্রাজিল

স্কোর:

ফ্রান্স ৩–০ ব্রাজিল

জিদান করেন:

⚽ গোল: ২

দুটি হেড।

ব্রাজিল স্তব্ধ।

বিশ্ব স্তব্ধ।

সেদিনের পর ফ্রান্সে তিনি শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না—

জাতীয় নায়ক হয়ে যান।

ইউরো ২০০০: বিশ্বের সেরা ফুটবলার

বিশ্বকাপের পর ইউরো ২০০০।

আবারও জিদানের জাদু।

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।

ফ্রান্স জিতে নেয় শিরোপা।

এই সময়টাকে অনেকেই বলেন—

“জিদানের স্বর্ণযুগ।”


রিয়াল মাদ্রিদ: গ্যালাকটিকোর মহাকাব্য

২০০১ সালে রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে কিনে নেয় প্রায় ৭৭.৫ মিলিয়ন ইউরোতে।

তখন সেটি ছিল বিশ্ব রেকর্ড ট্রান্সফার।

রিয়ালের হয়ে:

• ম্যাচ: ২২৭
• গোল: ৪৯

জিতেছেন:

  • ১টি লা লিগা
  • ১টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
  • ১টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ

ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল

২০০২ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল

রিয়াল বনাম লেভারকুসেন

রবার্তো কার্লোস বল তুলে দেন।

জিদান বাতাসে ভেসে উঠে বাঁ পায়ে ভলি মারেন।

গোল।

আজও অনেকে একে বলেন—

“ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ভলি।”


বিশ্বকাপ অধ্যায়–২: ২০০২ — হতাশা

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স যায় বিশ্বকাপে।

কিন্তু জিদান চোটে আক্রান্ত।

ফ্রান্স একটি গোলও করতে পারেনি।

গ্রুপ থেকেই বিদায়।


বিশ্বকাপ অধ্যায়–৩: ২০০৬ — শেষ নৃত্য

এটাই হওয়ার কথা ছিল তাঁর বিদায়ী বিশ্বকাপ।

৩৪ বছর বয়সী জিদানকে অনেকে শেষ ভেবেছিলেন।

কিন্তু তিনি আবারও জাদু দেখালেন।

ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল—

সম্ভবত ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচগুলোর একটি।

রোনালদো, কাকা, রোনালদিনহো—সবাই ছিলেন।

কিন্তু পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন জিদান।

২০০৬ বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান

• ম্যাচ: ৭
• গোল: ৩
• অ্যাসিস্ট: ১


সেই হেডবাট: ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত

ফাইনাল:

ফ্রান্স বনাম ইতালি

জিদান পেনাল্টিতে গোল করেন।

পরে অতিরিক্ত সময়ে ঘটে সেই ঘটনা।

মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে কথার লড়াই।

হঠাৎ—

জিদান মাথা দিয়ে আঘাত করেন।

লাল কার্ড।

পুরো বিশ্ব হতবাক।

বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে তাঁর একা হেঁটে চলে যাওয়ার দৃশ্য ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

আজও মানুষ প্রশ্ন করে—

কেন?

জিদান পরে বলেছিলেন—

“আমি অনুতপ্ত, কিন্তু কিছু কথা সহ্য করা কঠিন।”


পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯৯৪ সালে তিনি বিয়ে করেন ভেরোনিক ফার্নান্দেজকে।

তাঁদের চার ছেলে—

• এনজো
• লুকা
• থিও
• এলিয়াজ

মাঠের বাইরে জিদান বরাবরই নীরব।

সংবাদমাধ্যমের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন।


কোচ হিসেবে দ্বিতীয় জীবন

অবসর শেষে তিনি আবার রিয়ালে ফেরেন।

কোচ হিসেবে।

এবং ইতিহাস গড়েন।

জিতেছেন:

  • ৩টি টানা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
  • ২টি লা লিগা
  • ২টি ক্লাব বিশ্বকাপ

টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা কোচ—আধুনিক যুগে প্রায় অকল্পনীয় অর্জন।


ক্যারিয়ার ফ্যাক্টবক্স

📌 জন্ম: ২৩ জুন ১৯৭২
📌 জন্মস্থান: মার্সেই, ফ্রান্স
📌 প্রথম ক্লাব: US Saint-Henri
📌 প্রথম পেশাদার ক্লাব: Cannes
📌 জাতীয় দল অভিষেক: ১৭ আগস্ট ১৯৯৪
📌 প্রথম আন্তর্জাতিক গোল: চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে
📌 প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৯৮
📌 আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ১০৮
📌 আন্তর্জাতিক গোল: ৩১
📌 ক্লাব গোল: ১২৫+
📌 বিশ্বকাপ: ১ (১৯৯৮)
📌 ইউরো: ১ (২০০০)
📌 ব্যালন ডি’অর: ১ (১৯৯৮)


শেষকথা

ফুটবলে কেউ গোল দিয়ে অমর হন, কেউ ট্রফি দিয়ে।

জিদান অমর হয়েছেন তাঁর স্পর্শ দিয়ে।

তিনি কখনো সবচেয়ে দ্রুত ছিলেন না, সবচেয়ে বেশি গোলও করেননি।

কিন্তু মাঠে যখন বল তাঁর পায়ে থাকত, মনে হতো সময় কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে গেছে।

মার্সেইর অভিবাসী পাড়ার ছেলেটি শেষ পর্যন্ত ফুটবলকে শিখিয়েছিলেন—নীরবতাও কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর ভাষা হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments