পাপেট, চিত্রকলা, টেলিভিশন নাটক, আর শিশুদের মনন বিকাশের কিংবদন্তি কারিগর, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। ২৯ জুন ২০২৬, সোমবার সকাল সাড়ে আটটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ৯০ বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি নক্ষত্রের পতন ঘটল এবং অবসান হলো এক বর্ণাঢ্য ও বহুমাত্রিক অধ্যায়ের।
যাঁকে একনামে ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ বলা হয়, যিনি বিটিভির কালজয়ী সব অনুষ্ঠান ও নাটকের রূপকার, এবং যিনি চিত্রশিল্পে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি—তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে এক মলাটে বেঁধে পাঠকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরা হলো:
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক ঐতিহ্য
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তাঁর পারিবারিক আবহ ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ভরপুর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা এবং জমিলা খাতুনের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। বাবার সাহচর্যে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, গান ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবন ও চিত্রশিল্পে শ্রেষ্ঠত্ব
কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে মুস্তাফা মনোয়ারের পড়াশোনার হাতেখড়ি। দেশভাগের পর তিনি নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন এবং নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কলকাতায় ফিরে গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় মন বসেনি তাঁর। অবশেষে নিজের ভেতরের শিল্পসত্তাকে পূর্ণতা দিতে ভর্তি হন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে (Government College of Art & Craft)। ১৯৫৯ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদকসহ উত্তীর্ণ হন তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই ১৯৫৭ সালে নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় এবং ১৯৫৮ সালে তেলচিত্র ও জলরঙ শাখায় শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তিনি একাধিক স্বর্ণপদক লাভ করেন।
কর্মজীবন: পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন
মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রভাষক হিসেবে। তবে শুধু ক্যানভাসের ফ্রেমে নিজেকে আটকে না রেখে তিনি শিল্পের আলো ছড়িয়ে দিতে বেছে নেন টেলিভিশন মাধ্যমকে।
তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপমহাপরিচালক, ঢাকা কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের (এনআইএমসি) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
একাত্তরের প্রতিরোধ এবং ‘পতাকা না ওড়ানোর’ সাহসী গল্প
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বিটিভি থেকে ফজল-এ-খোদার লেখা ও আজাদ রহমানের সুরে ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতটি মুস্তাফা মনোয়ারের নির্দেশনায় প্রচারিত হয়। তাঁর অসাধারণ নির্দেশনার কারণে মাত্র ১০ জন শিল্পীর গাওয়া গানটি দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন শত শত কণ্ঠের গর্জন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতেও এই অভিনব প্রচারের প্রশংসা করা হয়েছে।
এর চেয়েও বড় সাহসিকতার পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ, পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে। নিয়ম অনুযায়ী অনুষ্ঠান শেষে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। টেলিভিশন স্টেশনের বাইরে তখন পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশের কড়া পাহারা। মুস্তাফা মনোয়ারের দূরদর্শী পরিকল্পনায় সেদিন মূল অনুষ্ঠানটি টেনে লম্বা করে রাত ১২টার পার করে দেওয়া হয়। ফলে পাকিস্তানের জাতীয় দিবস পার হয়ে যাওয়ায় আর পতাকা না দেখিয়েই সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
‘পাপেটম্যান’ ও শরণার্থী শিবিরের সেই মানবিক দিনগুলো
মুস্তাফা মনোয়ারকে বাংলাদেশে আধুনিক পাপেটের প্রবর্তক ও জনক বলা হয়। গ্রামবাংলার পুতুলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে তিনি একে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত, মলিন মুখ দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং ট্রমা দূর করতে তিনি সেই শরণার্থী শিবিরেই আয়োজন করেন তাঁর জীবনের প্রথম পাপেট শো।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্পূর্ণ দেশীয় ঘরানায় পাপেটকে তিনি আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বিটিভির ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তাঁর তৈরি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্র দুটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল ‘পারুল’—যা সাত ভাই চম্পার লোকগাথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত অ্যানিমেশন চরিত্র ‘মীনা’র বিকাশের সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
বিটিভির স্বর্ণযুগ, ‘নতুন কুঁড়ি’ ও দৃশ্যকলা
১৯৭২ সালে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে মুস্তাফা মনোয়ার গড়ে তোলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় রিয়ালিটি শো ‘নতুন কুঁড়ি’। এছাড়া শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’র মাধ্যমে তিনি প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যান। টেলিভিশন নাটকের সেটিং ও দৃশ্যকলায় তিনি বিপ্লব এনেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তাঁর নির্মিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং পরবর্তীতে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটক দুটির মঞ্চসজ্জা ও সেট ডিজাইন আজকেও টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপন এবং দ্বিতীয় সাফ গেমসের অফিশিয়াল মাসকট ‘মিশুক’ (হরিণ) তাঁরই সৃজনী ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর।
চিত্রশিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন
যদিও কর্মজীবনে পাপেট ও টেলিভিশন মাধ্যমকে তিনি বেশি সময় দিয়েছেন, তবুও চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে জলরং (Watercolor) এবং ড্রয়িংয়ে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। চারুকলার গবেষকদের মতে, জলরং ও ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের যে দুই-একজন সার্থক উত্তরসূরি পাওয়া যায়, মুস্তাফা মনোয়ার তাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৬৫ সালে তিনি চট্টগ্রামের মেয়ে মেরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির এক ছেলে সাদাত মনোয়ার (বাংলাদেশ বিমানের পাইলট) এবং এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার। এছাড়াও বিশ্বখ্যাত অস্কারজয়ী বাংলাদেশী অ্যানিমেটর নাফিস বিন জাফর হলেন মুস্তাফা মনোয়ারের বোনের নাতি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনের দোতলার ছোট্ট ওয়ার্কশপে পাপেট নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষায় মগ্ন থাকতেন এই আজীবন তরুণ শিল্পী।
পুরস্কার ও সম্মাননা
শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
- একুশে পদক (২০০৪): শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।
- সুলতান স্বর্ণপদক (২০১৮): বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত।
- টেনাশিনাস পদক (১৯৯০): টিভি নাটকে অবদানের জন্য।
- চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার (১৯৯২): চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য।
- আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড (২০১৩): আজীবন সম্মাননা পুরস্কার।
- এছাড়া জাপান প্রবাসীদের সংগঠন এবং বিভিন্ন জাতীয় শিশু সংগঠন থেকে তিনি বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন।
শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, ২৯ জুন রাতে এই মহান শিল্পীর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। ৩০ জুন (মঙ্গলবার) সকাল ৯টায় রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বেলা ১১টায় সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরদেহ চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের বিদায়ের জন্য। এরপর বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হবে।
মুস্তাফা মনোয়ার আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের পাপেটের প্রতিটি সুতোয়, শহীদ মিনারের লাল সূর্যের আভায়, আর লক্ষ লক্ষ শিশুর শৈশবের স্মৃতির ক্যানভাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। শিল্পের আলোয় তাঁর এই মহাপ্রস্থান এক অবিনশ্বর পদচিহ্ন রেখে গেল।



