ফরিদপুর প্রতিনিধি | ২৬ জুন, ২০২৬
ফরিদপুরে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৫ জুন রাত থেকে ফেসবুকে প্রান্তকে আটকের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ডিবির অভিযানের ধরন এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও রহস্যের দানা বাঁধছে।
নিহত মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী এবং মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।
ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা গেছে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রান্ত গোন্দারদিয়া এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পরনে ছিল লুঙ্গি এবং কাঁধে একটি ল্যাপটপের ব্যাগ। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এ সময় সেখানে ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
- শারীরিক লাঞ্ছনা: ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি প্রথমে ইশতিয়াকের গতি রোধ করেন এবং অন্য এক ব্যক্তি এসে তাকে তল্লাশি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে দুই হাত দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর, সাদা টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি প্রান্তকে সজোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এ সময় লাল টি-শার্ট পরা অন্য এক ব্যক্তি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আর মারিস না।”
- লাঠি নিয়ে আসার নির্দেশ: ভিডিওতে চেক শার্ট পরা আরেক ব্যক্তিকে মুঠোফোনে বলতে শোনা যায়, “লাঠি নিয়ে মরিচাবাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন।” পরবর্তীতে তাকেও ইশতিয়াকের দেহ তল্লাশির কাজে অংশ নিতে দেখা যায়।
- মাদক উদ্ধারের নাটক সাজানোর সংশয়: অভিযানের একপর্যায়ে সেখানে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস এসে পৌঁছায়। ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে কিছু একটা দেখিয়ে বলতে শোনা যায়, “এই যে এক টোপলা।” তবে ভিডিওর দৃশ্য অনুযায়ী, উক্ত বস্তুটি প্রান্তকে তল্লাশি করার স্থান থেকে কিছুটা দূরে পড়ে ছিল, যা নিয়ে স্থানীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ ও ঘুস দাবির চাঞ্চল্যকর তথ্য
নিহত প্রান্তর মা খাদিজা আক্তার ডিবির বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ এনেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান:
“প্রথমে ডিবি পুলিশ আমাদের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ৬৫ হাজার টাকা দাবি করেছিল এবং বলেছিল এই টাকা দিলে প্রান্তকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রান্তর ছাত্ররাজনীতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ সংক্রান্ত কিছু তথ্য মোবাইলে ভাইরাল হওয়ায় ডিবি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।”
খাদিজা আক্তার আরও অভিযোগ করেন, ডিবি পুলিশ পরবর্তীতে জানায় যে প্রান্ত ছাত্রলীগ করে, তাই তাকে আজ ছাড়া হবে না। পরদিন সকালে ১ লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাওয়ার জন্য বলা হয় এবং টাকা না দিলে তাকে কোর্টে চালান করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, পুলিশি হেফাজতেই প্রান্তর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি: “মৃত্যু মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে”
ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে নির্যাতনের সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। গত ২২ জুন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানান:
- স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি: পুলিশ সুপারের দাবি অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রান্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় অসুস্থতা বোধ করলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
- আঘাতের চিহ্ন নেই: তিনি জানান, প্রান্তর প্রাথমিক সুরতহালে শরীরের কোথাও কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (Brain Hemorrhage) কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
- অভ্যন্তরীণ তদন্ত: পুলিশ সুপার আরও যুক্ত করেন, “যেহেতু এটি পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় ঘটেছে, তাই এই বিষয়ে যেন কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ না থাকে, সেজন্য আমরা আমাদের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত (Internal Inquiry) কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
এদিকে, ছাত্রলীগ কর্মী প্রান্তর এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে স্থানীয় বিএনপি। ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ. কে. এম. কিবরিয়া এবং স্থানীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ প্রান্তর জানাজায় অংশ নিয়ে এই ঘটনাটিকে একটি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা অবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দোষী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



