কূটনীতিতে উত্থান, অর্থনীতিতে চাপ, আইন-শৃঙ্খলায় প্রশ্ন, সংস্কারে অপেক্ষা
সম্পাদকীয় নোট
একটি সরকারের প্রথম ১০০ দিন কখনোই তার পূর্ণ মেয়াদের চূড়ান্ত বিচার নয়। তবে এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। সরকার কোন খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কোথায় সফল হচ্ছে এবং কোথায় পিছিয়ে পড়ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই TODAY TV BD-এর এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
আমরা বিশ্লেষণ করেছি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—কূটনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি তুলে ধরেছি জনপ্রত্যাশা বনাম বাস্তবতার ব্যবধান এবং আগামী এক বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো।
📊 প্রথম ১০০ দিনের স্কোরকার্ড
খাত স্কোর মূল্যায়ন
কূটনীতি ৮/১০ ★★★★☆
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ৭/১০ ★★★★☆
সামাজিক নিরাপত্তা ৭/১০ ★★★★☆
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ৫/১০ ★★★☆☆
অর্থনীতি ৫/১০ ★★★☆☆
আইন-শৃঙ্খলা ৪/১০ ★★☆☆☆
প্রশাসনিক সংস্কার ৪/১০ ★★☆☆☆
বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তুত। ১০ = সর্বোচ্চ সাফল্য।
📦 ডেটা বক্স
প্রথম ১০০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
· সরকার গঠন: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
· মূল্যায়ন সময়কাল: ১০০ দিন
· মন্ত্রিসভা বৈঠক: ১০
· নীতিগত সিদ্ধান্ত: ৬০
· বাস্তবায়িত সিদ্ধান্ত: ৩৭
· বাস্তবায়ন হার: ৬২%
· UNGA সভাপতি নির্বাচনে ভোট: ৯৯
· হাম মোকাবিলায় জরুরি বরাদ্দ: ৳৬০৪ কোটি
· জঙ্গল সলিমপুর এলাকা: ৩,১০০ একর
· রিজার্ভ (মে ২০২৬ শেষে): ~১৮ বিলিয়ন ডলার
· মূল্যস্ফীতি (শুরুতে ১০%, শেষে ৮.৫%)
⚡ QUICK TAKE
🟢 সবচেয়ে বড় সাফল্য → জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ
🟢 সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি → ফ্যামিলি কার্ড
🟢 সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা → বহুমাত্রিক কূটনীতি
🟡 সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ → মূল্যস্ফীতি
🟠 সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকট → হাম
🔴 সবচেয়ে দুর্বল খাত → আইন-শৃঙ্খলা
🔴 সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন → প্রতিষ্ঠান সংস্কার
📅 টাইমলাইন: প্রথম ১০০ দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপঞ্জি
· ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ – সরকার গঠন ও শপথ
· মার্চ ২০২৬ – সংসদের প্রথম অধিবেশন (জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার বিতর্ক)
· মার্চ–এপ্রিল – ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু
· এপ্রিল – স্কুল ফিডিং ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু
· এপ্রিল–মে – হামের প্রাদুর্ভাব তীব্রতর; জরুরি স্বাস্থ্য বরাদ্দ
· মে ২০২৬ – পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সভাপতি নির্বাচিত
· মে–জুন – ১০০ দিন পূর্ণ; বাজেট প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনা
ভূমিকা: পরিবর্তনের প্রত্যাশা, বাস্তবতার মুখোমুখি এক সরকার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে মানুষ দেখে আসছে—সরকার বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়, কিন্তু জনজীবনের মৌলিক চিত্রটি প্রায়শই একই থাকে। তবে ২০২৬ সালের ক্ষমতা পরিবর্তন ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার নেয়, যখন জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তন চাননি—তারা চেয়েছিলেন রাষ্ট্রের আচরণে পরিবর্তন।
মানুষ চেয়েছিল—
✓ বাজারে স্বস্তি
✓ কর্মসংস্থান
✓ নিরাপত্তা
✓ দুর্নীতি হ্রাস
✓ প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
✓ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান
প্রথম ১০০ দিনে সরকারকে একসঙ্গে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রিজার্ভের ওপর চাপ, আইন-শৃঙ্খলা সংকট, হামের প্রাদুর্ভাব এবং প্রতিষ্ঠানগত আস্থার সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে।
“একটি সরকারের ১০০ দিন তার পুরো মেয়াদের চূড়ান্ত রায় নয়। তবে এটি বলে দেয়—সরকার কোন পথে হাঁটছে, কোন অগ্রাধিকারকে সামনে রাখছে, এবং ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে।”
অধ্যায় ১
কূটনীতি: সরকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও আলোচিত সাফল্য কূটনৈতিক অঙ্গনে। অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ বড় বিজয় অর্জন করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৯৯ ভোট পেয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। চার দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হলো।
এটি শুধু সম্মান নয়—বরং কৌশলগত সাফল্য:
· ভারত ও চীন – উভয় দেশের সমর্থন নিশ্চিত করে ‘ব্যালেন্সিং কূটনীতি’র উৎকর্ষ
· মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ – গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্বাগত, নীতি সহায়তা বজায়
· মধ্যপ্রাচ্য – প্রবাসী শ্রমবাজারে অবস্থান সুসংহত
রোহিঙ্গা ইস্যু: সরকার জাতিসংঘে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে ‘প্রধান কূটনৈতিক লক্ষ্য’ হিসেবে তুলে ধরেছে, তবে মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
ভারসাম্যের কূটনীতি (মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট):
একযোগে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, তুরস্ক ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্লেষক ড. তৌহিদ হোসেন বলেন,
“প্রথম ১০০ দিনে কূটনীতি ১০-এর মধ্যে ৮ পায়। এখন চ্যালেঞ্জ—এই অর্জনকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূলধনে রূপান্তর করা।”
অধ্যায় ২
অর্থনীতি: সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র
কূটনীতি যত সাফল্যময়, অর্থনীতি তত কঠিন বাস্তব। জনগণের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে বাজারের ওপর—চাল, ডাল, তেল, বিদ্যুৎ, চাকরি। এখানে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
মূল্যস্ফীতি: শুরুতে ছিল প্রায় ১০%। ১০০ দিন শেষে ৮.৫%-এ নেমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি। ৬৮% মানুষ মনে করেন বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ।
ব্যাংকিং খাত: খেলাপি ঋণ বেড়ে ২.২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তিনটি ব্যাংক ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণে’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
রিজার্ভ ও বিনিয়োগ: রিজার্ভ নেমেছে ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। বিদেশি বিনিয়োগ ধরে রাখতে ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন ডেস্ক’ গঠন করা হয়েছে।
রেমিট্যান্স: আশার আলো—প্রবাহ ইতিবাচক, তবে একা রেমিট্যান্স দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর বলেন,
“এখনো শুধু সংকট ব্যবস্থাপনা দেখছি, কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান নয়। আগামী ছয় মাসে বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যাংকিং সংস্কারই প্রকৃত পরীক্ষা।”
অধ্যায় ৩
সামাজিক নিরাপত্তা: জনপ্রিয়তা নাকি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান?
সরকারের সবচেয়ে আলোচিত তিনটি কর্মসূচি:
১. ফ্যামিলি কার্ড – ৫০ লক্ষ নিম্নআয়ের পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা।
২. কৃষক কার্ড – ২০ লক্ষ কৃষককে ভর্তুকিযুক্ত সার ও বীজ।
৩. স্কুল ফিডিং – ১ কোটি শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর খাবার।
সমালোচনা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ‘ভোটারি পপুলিজম’ স্বল্পমেয়াদে দুর্ভোগ কমালেও টেকসই কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্যের স্থায়ী সমাধান নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তালিকা কতটা নির্ভুল? দলীয় প্রভাব কতটুকু?
এক উপকারভোগী রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন,
“ফ্যামিলি কার্ডে দুই মাস টাকা পেয়েছি। কিন্তু দাম এত বাড়ছে যে তা সপ্তাহেই শেষ।”
অধ্যায় ৪
স্বাস্থ্য সংকট: হামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই
এপ্রিল-মে ২০২৬-এ হামের প্রাদুর্ভাব সরকারের জন্য অপ্রত্যাশিত মানবিক পরীক্ষা নিয়ে আসে।
সংকটের মাত্রা:
· শনাক্ত ২২,০০০+ (সরকারি), মৃত্যু ১১৪ (বেসরকারি হিসাবে ২০০+)
· কারণ: টিকাদানে ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, উদ্বাস্তু এলাকায় কম কভারেজ
সরকারের পদক্ষেপ:
· জরুরি বরাদ্দ ৬০৪ কোটি টাকা
· ১.৫ কোটি শিশুকে বিশেষ টিকাদান
· ৫,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক সক্রিয়
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বীরেন্দ্রনাথ নন্দী বলেন,
“প্রতিক্রিয়া দেরিতে এসেছে। প্রথম মাসে অলসতা ছিল। এখন অভিযান জোরদার, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে টিকা কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।”
অধ্যায় ৫
আইন-শৃঙ্খলা: সরকারের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র
একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল নিরাপত্তার দ্রুত উন্নতি। কিন্তু ১০০ দিন শেষে আইন-শৃঙ্খলা খাতে সরকার সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে (৪/১০)।
জঙ্গল সলিমপুর: চট্টগ্রামের ৩,১০০ একর পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। র্যাব কর্মকর্তা নিহতের ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে—রাষ্ট্রের ভেতরে কি ‘রাষ্ট্রহীন অঞ্চল’ তৈরি হয়েছে?
মব ভায়োলেন্স ও চাঁদাবাজি:
· ফেনীতে গুজবে পিটিয়ে হত্যা
· সাতক্ষীরায় শিক্ষককে চাঁদা না দেওয়ায় হত্যা
· ব্যবসায়ীদের সংগঠনের অভিযোগ—প্রশাসন নীরব
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ (অব.) বলেন,
“র্যাব সংস্কার করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পুলিশের মনোবল কম। জননিরাপত্তা ফেরাতে একযোগে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সংস্কার জরুরি।”
“জঙ্গল সলিমপুর একটি ভূখণ্ডের নাম নয়—এটি একটি প্রশ্নের নাম: রাষ্ট্র কি সত্যিই পুরো ভূখণ্ডে সমানভাবে কার্যকর?”
অধ্যায় ৬
প্রশাসনিক সংস্কার: ঘোষণা বনাম বাস্তবতা
সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘পাবলিক সার্ভিস রিফর্ম টাস্কফোর্স’ গঠিত হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো সীমিত।
ব্যক্তি বদল বনাম প্রতিষ্ঠান সংস্কার: নতুন মুখ এলেই সংস্কার হয় না। বিচার বিভাগ, দুদক, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ—এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো অধরা।
দুর্নীতি দমন: দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগ বিতর্কিত। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির কোনো মামলা এখনো হয়নি।
প্রশাসন গবেষক ড. সেলিনা হোসেন বলেন,
“প্রতিশ্রুতি ছিল ‘শূন্য সহনশীলতা’—বাস্তবতা এখনো ‘প্রতীক্ষার সংস্কৃতি’। সরকার যদি দ্রুত জবাবদিহিতা ফিরিয়ে না আনে, তাহলে পুরনো কাঠামোই টিকে থাকবে।”
অধ্যায় ৭
রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা: সংঘাত নাকি সংলাপ?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক হাতে কূটনৈতিক সাফল্য, অন্য হাতে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। সংসদে প্রথম অধিবেশন থেকেই জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ইতিবাচক দিক: সরকার বিরোধীদের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। সংসদীয় কার্যক্রম সচল রাখা, আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা ইতিবাচক সংকেত।
ঝুঁকি: সংস্কার নিয়ে মতবিরোধ, সংবিধান সংশোধন বিতর্ক এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ আগামী মাসগুলোতে বাড়তে পারে—বিশেষত বাজেট ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফারুক ওয়াসিফ বলেন,
“গণতন্ত্রের জন্য সংলাপ জরুরি। কিন্তু এই সরকার এখনো পুরনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে বিরোধীসহ সব পক্ষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ কথাবার্তা শুরু করতে পারেনি।”
🔍 তুলনামূলক বিশ্লেষণ: জনপ্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
জনগণ যা চেয়েছিল সরকার যা দিয়েছে ব্যবধান
বাজারে স্বস্তি মূল্যস্ফীতি ৮.৫% (শুরু ১০%) আংশিক, কিন্তু অপর্যাপ্ত
কর্মসংস্থান স্থবির বিনিয়োগ বড় ব্যবধান
নিরাপত্তা জঙ্গল সলিমপুর, মব ভায়োলেন্স ব্যর্থ
দুর্নীতি হ্রাস উচ্চপর্যায়ে কোনো মামলা নেই ব্যর্থ
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা সংস্কার টাস্কফোর্স, বাস্তবায়ন সীমিত শুরু, কিন্তু দৃশ্যমান নয়
শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কূটনীতিতে সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল, দেশে নয়
সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ: সরকার যেখানে সফল (কূটনীতি), সেটি জনগণের প্রত্যাশার তালিকায় ছিল না। আর যেখানে জনগণ সবচেয়ে বেশি ফলাফল চেয়েছিল (অর্থনীতি, নিরাপত্তা, দুর্নীতি), সেখানে দৃশ্যমান উন্নতি সীমিত।
📉 রিস্ক মিটার (আগামী ১২ মাসের ঝুঁকি)
| খাত | ঝুঁকি |
| কূটনীতি | নিম্ন |
| সামাজিক নিরাপত্তা | নিম্ন |
| রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা | মাঝারি |
| স্বাস্থ্য | মাঝারি |
| অর্থনীতি | উচ্চ |
| আইন-শৃঙ্খলা | উচ্চ |
| প্রশাসনিক সংস্কার | উচ্চ |
👥 জনগণ এখন কী দেখতে চায়? (জরিপ ভিত্তিক)
✓ বাজারে স্বস্তি
✓ চাকরি বৃদ্ধি
✓ দুর্নীতি হ্রাস
✓ চাঁদাবাজি দমন
✓ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
✓ ব্যাংকিং খাত সংস্কার
✓ বিনিয়োগ বৃদ্ধি
✓ স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন
📅 আগামী ৩৬৫ দিন: সরকারের বড় পরীক্ষা
· অর্থনীতি: মূল্যস্ফীতি কমিয়ে বাজারে স্বস্তি
· ব্যাংকিং খাত: খেলাপি ঋণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা
· আইন-শৃঙ্খলা: জঙ্গল সলিমপুরসহ অপরাধপ্রবণ এলাকায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা
· প্রশাসনিক সংস্কার: বিচার বিভাগ, দুদক, নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা
· সামাজিক নিরাপত্তা: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন
· স্বাস্থ্য: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ
· কূটনীতি: জাতিসংঘের ভূমিকা ব্যবহার করে রোহিঙ্গা সংকট ও বিদেশি বিনিয়োগ
✍ সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ
কোথায় সফল, কোথায় পিছিয়ে?
সাফল্যের তিন স্তম্ভ:
- আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জাতিসংঘের সভাপতিত্ব
- রাজনৈতিক বৈধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংসদীয় কার্যক্রম সচল
- সামাজিক নিরাপত্তার দ্রুত পদক্ষেপ (ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড)
দুর্বলতার চার ক্ষেত্র:
- অর্থনীতি—মূল্যস্ফীতি ও বাজারে অস্থিরতা
- আইন-শৃঙ্খলা—জঙ্গল সলিমপুর ও মব ভায়োলেন্স
- প্রশাসনিক সংস্কার—কাঠামোগত পরিবর্তনের অভাবে
- স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—হাম সংকটে দেরিতে প্রতিক্রিয়া
“সরকার কি কেবল প্রকল্পভিত্তিক জনপ্রিয়তা অর্জন করবে, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী বছরগুলোতে সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।”
⚖ চূড়ান্ত মূল্যায়ন
আশা জাগিয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ করেনি
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে এককথায় সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন।
যেখানে সফল: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। জাতিসংঘের সভাপতিত্ব, বহুমুখী কূটনীতি এবং কিছু সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
যেখানে পিছিয়েছে: অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক সংস্কারে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জনগণ যে পরিবর্তন চেয়েছিল, তা এখনো দৃশ্যমন নয়।
বাংলাদেশ বহুবার সরকার পরিবর্তন দেখেছে। এখন মানুষ রাষ্ট্রের আচরণে পরিবর্তন দেখতে চায়—প্রতিদিনের জীবনে, বাজারে, পুলিশ স্টেশনে, হাসপাতালে, স্কুলে।
আগামী ৬ থেকে ১২ মাসই নির্ধারণ করবে—
এই সরকার ইতিহাসে শুধু কূটনৈতিক সাফল্যের সরকার হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি অর্থনীতি, সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রেও একটি নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
প্রথম ১০০ দিনের গল্প অসমাপ্ত। পরবর্তী অধ্যায়ই নির্ধারণ করবে—এটি সফলতার ইতিহাস হবে, নাকি অপূর্ণ প্রত্যাশার আরেকটি রাজনৈতিক অধ্যায়।
“জনগণ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়।”




