Homeটুডে হেলথবাটারহীন ‘বাটার কুকিজ’, দই ছাড়া ‘লাচ্ছি’: মোড়কের অনুমোদনে বিএসটিআইয়ের গাফিলতি

বাটারহীন ‘বাটার কুকিজ’, দই ছাড়া ‘লাচ্ছি’: মোড়কের অনুমোদনে বিএসটিআইয়ের গাফিলতি

দেশের নামী খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লেবেলিংয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি; নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘনের মহোৎসব।

ঢাকা | ৩১ মে ২০২৬
দেশের বাজারে নামকরা খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যের মোড়ক ও লেবেলিংয়ে (Labeling) ভয়াবহ জালিয়াতি, সুস্পষ্ট প্রতারণা এবং ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র সামনে এসেছে। বিস্কুটের নাম “বাটার কুকিজ” দিয়ে ভেতরে মাখনের পরিবর্তে ডালডা বা বনস্পতি ব্যবহার এবং ঐতিহ্যবাহী পানীয় “লাচ্ছি”র নামে টক দই ছাড়াই কৃত্রিম সুগন্ধি ও সুইটনার মিশ্রিত ড্রিংক বিক্রি করছে বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ড। উভয় ক্ষেত্রেই বিএসটিআই (BSTI) আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এবং নিরাপদ খাদ্য আইন সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করা হলেও এসব মোড়কের বৈধতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সরকারি কর্মকর্তারা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

বাটার কুকিজে বাটারের ‘ব’-ও নেই: ভেজেটেবল ফ্যাটের কারসাজি

Oplus_131072

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডের বিস্কুটের প্যাকেটের গায়ে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে “BUTTER COOKIES BISCUIT”। তবে এর ঠিক নিচে থাকা উপাদান (Ingredients) তালিকায় মাখনের (Butter) কোনো অস্তিত্বই নেই। সেখানে প্রধান উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—ময়দা, চিনি, এডিবল ভেজেটেবল ফ্যাটস ও তেল (Edible Vegetable Fats & Oil), মিল্ক পাউডার, সোডিয়াম ক্লোরাইড (সল্ট), লিভেনিং এজেন্ট [E-500 (ii), E-503 (ii)], ইমালসিফায়ার (E-322), অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (E-319) এবং অনুমোদিত কৃত্রিম সুগন্ধি (Permitted Artificial Flavor)।

বিশেষজ্ঞ ও খাদ্য বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিয়ম অনুযায়ী কোনো পণ্যের নাম যদি নির্দিষ্ট কোনো উপাদানের (যেমন: বাটার) নামে নামকরণ করা হয়, তবে ওই পণ্যে অবশ্যই সেই উপাদানের বাস্তব উপস্থিতি থাকতে হবে। এখানে মাখনের পরিবর্তে সস্তা ভেজেটেবল ফ্যাট বা ডালডা-বনস্পতি ব্যবহার করে একে ‘বাটার কুকিজ’ হিসেবে বাজারজাত করা সরাসরি উপভোক্তাদের সাথে প্রতারণা।

দই-চিনি ছাড়া রাসায়নিকের ‘লাচ্ছি’: মিল্ক অ্যাডেড ড্রিংকের ফাঁদ

প্রতারণার আরেকটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে একটি নামিদামি কোম্পানির দুগ্ধজাত পানীয়তেও। ঐ কোম্পানির বোতলজাত পানীয়র গায়ে বড় হরফে লেখা রয়েছে “লাচ্ছি”। কিন্তু ঠিক তার নিচেই অত্যন্ত ছোট অক্ষরে যুক্ত করা হয়েছে “ইয়োগার্ট ফ্লেভার্ড মিল্ক অ্যাডেড ড্রিংক” (Yogurt Flavored Milk Added Drink)।

ঐতিহ্যগত এবং আইনগতভাবে “লাচ্ছি” তৈরি হতে হলে তাতে অবশ্যই টক দই, পানি এবং চিনি থাকতে হবে। কিন্তু এই পণ্যের উপাদান তালিকায় দেখা যায়, এতে টক দইয়ের কোনো নামনিশানা নেই। এর উপাদানগুলো হলো—পানি, চিনি, মিল্ক পাউডার, স্ট্যাবিলাইজার: পেকটিন (E-440), সাইট্রিক অ্যাসিড (E-330), সোডিয়াম সাইট্রেট (E-331), ল্যাকটিক অ্যাসিড, প্রিজারভেটিভ: পটাশিয়াম সরবেট (E-202) এবং অনুমোদিত কৃত্রিম সুগন্ধি (মিল্ক, ইয়োগার্ট)। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এখানে চিনির পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষতিকর কৃত্রিম সুইটনার বা চিনির বিকল্প (Artificial Sweeteners: E-950, E-951)

খাদ্য আইন অনুযায়ী, যদি কোনো পানীয় কৃত্রিম ফ্লেভার দিয়ে তৈরি করা হয়, তবে তার মূল নাম কোনোভাবেই ‘লাচ্ছি’ দেওয়া যাবে না; তাকে শুধু ‘ইয়োগার্ট ফ্লেভার্ড ড্রিংক’ হিসেবেই বিক্রি করতে হবে। সাধারণ ক্রেতারা বোতলের গায়ের বড় ‘লাচ্ছি’ লেখা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে এটি কিনছেন, যা নিরাপদ খাদ্য আইনের পরিপন্থী।

📋 এক নজরে পণ্যের উপাদান জালিয়াতি

আমলাতান্ত্রিক নীরবতা ও ‘আজন্ম পাপ’

বাজারজাতকরণের আগে প্রতিটি খাদ্যের মোড়ক ও উপাদানের লেবেল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে অনুমোদন দেওয়ার আইনি দায়িত্ব বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর। কিন্তু এই দুই পণ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিএসটিআই জেনেশুনেই এই বিভ্রান্তিকর মোড়কের অনুমোদন দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের তদারকিতে থাকা সরকারি আমলা ও কর্মকর্তাদের এই রহস্যজনক নীরবতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা খাতকে এক গভীর সংকটে ফেলেছে।

অতীতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে উল্টো সৎ ও কঠোর কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে—এমন নজিরও রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, খাদ্যের লেবেলে এমন হাজার হাজার অনিয়ম ও প্রতারণা প্রতিদিন সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে।

🔍 ফ্যাক্ট চেক

যা নিশ্চিত (Verified Facts):

  • ১ম ছবি অনুযায়ী, ‘বাটার কুকিজ’ বিস্কুটে কোনো বাটার বা মাখন নেই, কেবল এডিবল ভেজেটেবল ফ্যাট রয়েছে।
  • ২য় ছবি অনুযায়ী, ‘লাচ্ছি’ পানীয়টিতে কোনো টক দই নেই, এটি মূলত মিল্ক পাউডার, অ্যাসিড ও ফ্লেভারের মিশ্রণে তৈরি একটি ড্রিংক।
    যা দাবি করা হচ্ছে (Attributed Claims):
  • ভোক্তা অধিকার সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের মোড়ক বাজারে ছাড়ার অনুমতি দিয়ে বিএসটিআই এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
    যা তদন্তাধীন (Under Investigation):
  • ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার বাইরে কেবল লেবেল দেখেই এই দুই পণ্যের জালিয়াতি স্পষ্ট। তবে বিএসটিআই ঠিক কী শর্তে এবং কোন নীতিমালার অধীনে এই লেবেলগুলোর অনুমোদন দিয়েছিল, তা এখনো জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়।

📌 তথ্যসূত্র:

  • Official Data: পণ্যের মোড়কে মুদ্রিত উপাদান তালিকা (Ingredients List)
  • Court & Government Documents: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং বিএসটিআই অধ্যাদেশ।
  • সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলনের ফেসবুক পোস্ট

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular