কলকাতা | ২২ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ‘গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকর করার রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রথাগত ধর্মীয় মেরুকরণের সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টে গিয়ে রাজ্যে এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিয়েছে। একদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আইনি জটিলতা এড়াতে এবার প্রকাশ্যে গরু কোরবানি না দেওয়ার বা বয়কটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, অনুৎপাদনশীল গবাদিপশুর রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল খরচ ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চরম লোকসান এবং দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন প্রধানত সনাতন ধর্মাবলম্বী দুগ্ধ খামারিরা।
আইনি কড়াকড়ি ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের গবাদিপশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনটি কঠোরভাবে বলবৎ করার প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই আইনের মূল শর্ত হলো, কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী বা স্থায়ীভাবে কাজের অনুপযুক্ত গবাদিপশুই সরকারি সনদ সাপেক্ষে এবং নির্দিষ্ট কসাইখানায় জবাই করা যাবে। এর লঙ্ঘন ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গবাদিপশু পরিবহনকারী এবং খামারিরা পুলিশ ও কট্টরপন্থী দলগুলোর তল্লাশির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১৬ মে হিঙ্গলগঞ্জের বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গরুর ট্রাক থামিয়ে পশুর ‘জন্ম সনদ’ দাবি করার পর বিষয়টি জাতীয় স্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, যাকে নেটিজেনরা ‘উনো রিভার্স’ বা ভূমিকা বদলের মুহূর্ত বলছেন। বিভিন্ন ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম যুবকরা গবাদিপশু বহনকারী ট্রাক থামিয়ে হিন্দু বিক্রেতাদের বুঝিয়ে পশুসহ বাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এই সংক্রান্ত ডিজিটাল কন্টেন্টগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, যার একটি আঞ্চলিক প্রতিবেদন মাত্র এক দিনে ফেসবুকে ৩০ লাখ ও ইউটিউবে ১০ লাখ ভিউ পার করেছে। তবে এই ভিডিওগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শূন্য পশুর হাট ও খামারিদের সংকট
রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম গরুর হাটগুলো—যেমন শুনুকপাহাড়ি, মায়াপুর, ধোলা, বীরশিবপুর এবং স্বরূপনগর হাট—ঈদের আগে সাধারণত কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে মুখরিত থাকে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, এ বছর হাটগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ক্রেতাশূন্য।
খামারিদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি দুগ্ধবতী গরু সাধারণত ৭ থেকে ৮ বছর পর দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রতিদিন একটি গরুর পেছনে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হিসাব করলে, দুধ দেওয়া বন্ধ করার পর তাকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে অতিরিক্ত প্রায় ৭.৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। ১৪ বছর বয়সী একটি দুর্বল ও রোগাক্রান্ত গরুর মাংসের বাণিজ্যিক কোনো মূল্য থাকে না। ফলে কৃষকদের জন্য এই নতুন নিয়মের অর্থ হলো, অনুৎপাদনশীল পশুকে অনির্দিষ্টকাল বসিয়ে খাওয়ানো, যা তাদের আর্থিকভাবে দেউলিয়া করে দিচ্ছে।
৪২ বছর বয়সী খামারি সুরজিৎ ঘোষ জানান, গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করলে তা বিক্রি করেই তারা নতুন বাছুর কেনেন। এবার বিক্রি করতে না পারলে তার ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা লোকসান হবে। একইভাবে, খামারি বিশ্বজিৎ ঘোষ ও ভাস্কর ঘোষ জানান, তাদের যথাক্রমে ১ কোটি ও ১৫ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। পশু বিক্রি বন্ধ থাকলে পশুখাদ্য ও ওষুধের বকেয়া শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং খামারিদের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই
বিজেপি নেতা অবনী মন্ডল খামারিদের এই ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কথা স্বীকার করে বলেছেন, “এটি ১৯৫০ সালের একটি আইন যা আগের সরকারগুলো কার্যকর করতে পারেনি। আমরা আইনের শাসন কায়েম করছি। সাময়িক কিছু সমস্যা হচ্ছে, যা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে খামারিদের জন্য কিছু একটা ভাবতে হবে।”
অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এবং সিপিআই(এম) বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে আইনের ১২ নম্বর ধারার আওতায় ধর্মীয় প্রয়োজনে গবাদিপশু জবাইয়ের বিশেষ ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে দরিদ্র পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষকরা তীব্র আর্থিক সংকট থেকে রক্ষা পান।
কলকাতা হাইকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সরকারি পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়েছে, যার একটি করেছে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন। দলটির রাজ্য নেতা মলয় তিওয়ারি জানান, “একটি সেকেলে আইনকে গো-রক্ষার নামে গ্রামীণ জীবনজীবিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে আমরা অন্তর্বর্তী আদেশের দাবি জানিয়েছি।” মামলার পক্ষে আইনজীবী শামিম আহমেদ আদালতে যুক্তি দেন যে, পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা অবকাঠামো, সনদ প্রদান প্রক্রিয়া বা কসাইখানার আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত না করেই রাজ্য সরকার হঠাৎ এই অকার্যকর আইনকে সক্রিয় করেছে, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
বর্ণ ও সামাজিক ইস্যু বিশেষজ্ঞ কুমার রানা উল্লেখ করেন, যদিও ঘোষ বর্ণ বাংলায় পশুপালনের সাথে সবচেয়ে বেশি যুক্ত, তবুও বহু গ্রামীণ নিম্নবিত্ত মানুষ গবাদিপশুকে তাদের জরুরি আপদকালীন আর্থিক বীমা হিসেবে ব্যবহার করে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম সমাজ যদি গরুর মাংস খাওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়, তবে বিকল্প প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মুরগি, খাসি এবং মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এর প্রভাব কেবল গরুর মাংসের অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পশুখাদ্য সরবরাহ, চামড়া শিল্প, কসাইখানা, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের সাথে জড়িত লাখ লাখ গ্রামীণ দিনমজুরের জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দেবে। ফলে এই সংকট এখন আর কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির টিকে থাকার এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: কলকাতা হাইকোর্ট পিটিশন রেকর্ডস, পশ্চিমবঙ্গ পশুসম্পদ বিকাশ দপ্তর, আইএলএস (ILS) এবং স্থানীয় বাজার সমীক্ষা প্রতিবেদন (মে ২০২৬)।



