কলকাতা ব্যুরো | টুডে টিভি বিডি
২৮ এপ্রিল, ২০২৬
কলকাতা: আগামীকাল বুধবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের এক ভাগ্যনির্ধারক দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। এই দফায় লড়াই হবে ১৪২টি আসনে, যা আক্ষরিক অর্থেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ‘নিউক্লিয়াস’ বা শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলের একচেটিয়া আধিপত্য তৃণমূলকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছিল। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে বিজেপির ‘পদ্মফুল’ ফোটানোর মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে বাম-কংগ্রেস ও নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ-এর নতুন সমীকরণ—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে।
ভোটের অংক: কার কত শক্তি?
বুধবার দক্ষিণবঙ্গের মোট ৭টি জেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া।
- ২০২১-এর ফলাফল: এই ১৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১২৩টিতে, বিজেপি ১৮টিতে এবং আইএসএফ জিতেছিল ১টি আসনে।
- বিজেপির চ্যালেঞ্জ: ২০২১ সালে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপি ছিল ‘শূন্য’। তবে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের হিসাবে বিজেপি অনেক আসনে এগিয়ে থাকায় এবার তারা নতুন জমি তৈরির আশায় রয়েছে।
ভবানীপুর: ২০২৬-এর ‘নন্দীগ্রাম’
এই দফার সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্র হলো কলকাতার ভবানীপুর। এখানে লড়াই হচ্ছে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে। ২০২১-এ নন্দীগ্রামে হারের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভবানীপুর থেকেই উপ-নির্বাচনে জিতে বিধানসভায় ফিরেছিলেন। এবার শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি মমতার গড় হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। ভবানীপুরের বিচিত্র জনবিন্যাস (৪২% বাঙালি হিন্দু, ৩৪% অবাঙালি হিন্দু এবং ২৪% মুসলিম) কার দিকে পাল্লা ভারি করবে, তাই নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এসআইআর ও ‘ভোট কাটছাঁট’ বিতর্ক
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ইসিআই-এর Special Intensive Revision (SIR)। অভিযোগ উঠেছে, রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে কেবল দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনেই বাদ পড়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ ৩৬ হাজার নাম। তৃণমূলের অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘু ও তাদের ভোটব্যাংক লক্ষ্য করে এই ছাঁটাই করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, এটি ভোটার তালিকা ‘শুদ্ধিকরণ’ প্রক্রিয়ার অংশ।
মতুয়া ও সংখ্যালঘু সমীকরণ
- মতুয়া ভোট: উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার প্রায় ১৫টি আসনে মতুয়া ভোট প্রধান ফ্যাক্টর। ঠাকুরবাড়ির দুই মেরুতে অবস্থানকারী শান্তনু ঠাকুর (বিজেপি) এবং মমতাবালা ঠাকুর (তৃণমূল) ভোটারদের টানতে শেষ মুহূর্তের প্রচার চালিয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও নাগরিকত্ব (CAA) ইস্যু এখানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
- সংখ্যালঘু ও নওশাদ ফ্যাক্টর: এই দফার এক-তৃতীয়াংশ আসনে মুসলিম ভোট নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। গত ১৭ বছর এই ভোট তৃণমূলের একচেটিয়া থাকলেও এবার ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ এবং বামেদের জোট নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভাঙড়, আমডাঙা ও ক্যানিং এলাকায় নওশাদের সভাগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৃণমূলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
আরজি কর ও নাগরিক আন্দোলনের ছায়া
শহর ও শহরতলির আসনগুলোতে আরজি কর কাণ্ডের অভিঘাত এখনও স্পষ্ট। নির্যাতিতার মা পানিহাটি থেকে বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত লোকসভা ভোটে শহরাঞ্চলে তৃণমূলের ভোট কিছুটা কমতে দেখা গিয়েছিল। সেই ক্ষোভ কি এবার ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হবে, নাকি সরকারি প্রকল্পের (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার) সুফল আবারও তৃণমূলকে বৈতরণী পার করাবে, তার উত্তর মিলবে মে মাসের ৪ তারিখ।
কমিশনের কড়াকড়ি ও নবান্ন অভিযান
নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে থেকেই কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিককে অপসারণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপকে বিজেপির ‘অস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করে কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন কমিশনকে।
পশ্চিমবঙ্গের এই মহাযুদ্ধের দ্বিতীয় দফার ভোট আগামীকাল সকাল ৭টা থেকে শুরু হবে। দিনভর এই যুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের আপডেট পেতে চোখ রাখুন টুডে টিভি বিডি-তে।



