নয়াদিল্লি, ৬ জুন: ভারতের রাজধানী দিল্লির মালব্য নগরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানির শোকের মধ্যেও আলোচনায় এসেছে এক বাবা-ছেলের মানবিক উদ্যোগ। নিজেদের ব্যবসার প্রায় ২ লাখ রুপি মূল্যের নতুন ম্যাট্রেস ও বিছানাপত্র বিলিয়ে দিয়ে তারা অন্তত আটজন মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম NDTV-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ দিল্লির হাউজ রানি এলাকার ‘ফ্লারিশ স্টেজ’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে গত ৩ জুন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশিরাও ছিলেন।
তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত, যদি স্থানীয় দোকান মালিক রিয়াজউদ্দিন মানসুরি এবং তাঁর ছেলে আরমান মানসুরি দ্রুত উদ্যোগ না নিতেন।
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ভবনের ভেতরে আটকে পড়া লোকজন জানালা ও বারান্দা থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। পরিস্থিতি বুঝে রাস্তার বিপরীতে থাকা নিজেদের ম্যাট্রেসের দোকান থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি নতুন ম্যাট্রেস ও কাঁথা বের করে ভবনের নিচে বিছিয়ে দেন বাবা-ছেলে।
এর ফলে অনেকেই ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন।
আরমান মানসুরি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, “এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে আগুনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। নিচতলা পুরোপুরি আগুনে পুড়ছিল। কেউ ভেতরে ঢুকতে বা বের হতে পারছিল না। ওপরে আটকে পড়া লোকজন জানতে চাইছিল তারা লাফ দেবে কি না। তখনই আমরা দোকানের সব ম্যাট্রেস ও কাঁথা এনে নিচে বিছিয়ে দিই।”
পরিবারটির দাবি, উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত ম্যাট্রেস ও অন্যান্য সামগ্রীর মূল্য প্রায় ২ লাখ রুপি। শুধু ম্যাট্রেসই নয়, আহত ও নিহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিছানার চাদর এবং কাঁথার কভারও তারা বিনামূল্যে দিয়ে দেন।
রিয়াজউদ্দিন মানসুরি বলেন, “মানবতার খাতিরে আমি যা করেছি, তা আমার দায়িত্ব ছিল। মানুষ হিন্দু না মুসলিম—এটা বড় বিষয় নয়। আমরা সবাই মানুষ, সবাই ভারতীয়। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিয়াজউদ্দিন ও আরমানের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাদের আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “নিজের ব্যবসার ক্ষতির কথা না ভেবে তিনি অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। সরকারকে অবশ্যই তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।”
আরেকজন মন্তব্য করেন, “এ ধরনের নিঃস্বার্থ মানবিক কাজই সমাজকে এগিয়ে নেয়। এমন মানুষদের সম্মানিত করা প্রয়োজন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ম, জাতি কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংকটময় মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ঘটনা মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।
দিল্লির সেই আগুনে বহু পরিবার স্বজন হারিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে রিয়াজউদ্দিন মানসুরি ও তাঁর ছেলে আরমান দেখিয়ে দিয়েছেন—সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তেও মানবতা হারিয়ে যায় না। কখনও কখনও কয়েকটি ম্যাট্রেসই হয়ে উঠতে পারে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার শেষ আশ্রয়।
সূত্র: NDTV, PTI



