মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত; ৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন ফার্মা কর্মকর্তা
১৫ বছরের একলা লড়াই থামল ভোরের সড়কে; ৬ দিনেও হয়নি মামলা ও ময়নাতদন্ত; দুই ওসির মুখেই চেনা বুলি ‘অবগত নই’
📰 সম্পাদকীয় নোট
রাজধানীর বুকে ভোরবেলা একজন কর্মজীবী নারী তাঁর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীর শিকার হলেন, মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা গেলেন—অথচ ঘটনার ৬ দিন পরও কোনো মামলা হয়নি, হয়নি ময়নাতদন্ত। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, ঢাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ থানা কেবল ‘ভৌগোলিক সীমানার’ অজুহাতে কিংবা ‘কেউ অভিযোগ করেনি’ বলে ঘটনাটি এড়িয়ে যাচ্ছে।
এই বিশেষ ইনভেস্টিগেটিভ প্রতিবেদনটি কেবল একটি অপরাধের বিবরণ নয়; এটি ঢাকার সড়ক নিরাপত্তা, আইনি ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘ দেড় দশক ধরে একলা লড়ে যাওয়া এক মায়ের জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার এক চরম ট্র্যাজেডি।
📦 এক নজরে: ঘটনা ও আইনি স্থিতি
| সূচক ও উপাদান | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ |
|---|---|
| নিহত ব্যক্তি | সোহেলী ইসলাম সোমা (৪২), মেডিক্যাল সার্ভিস অফিসার, এসকেএফ (SKF) ফার্মাসিউটিক্যালস। |
| জীবনসংগ্রাম | স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর বিগত ১৫ বছর ধরে একাই মেয়েকে বড় করছিলেন। |
| ঘটনার সময় ও স্থান | ৭ জুন ২০২৬, সকাল সোয়া ৬টা; শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট। |
| অপরাধের ধরন | চলন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান (মোটরসাইকেল আরোহী ২ ছিনতাইকারী)। |
| থানা ও আইনি পদক্ষেপ | মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানা; ঘটনার ৬ দিন পরও কোনো মামলা বা ময়নাতদন্ত হয়নি। |
⚡ এক নজরে পুরো ঘটনা
- 🟢 একলা লড়া এক নারীর অবসান: বছর দুয়েক আগে বাবা এবং তার মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মাকেও হারান সোহেলী। পরিবারের সমস্ত ভার একা কাঁধে বয়ে বেড়ানো এই সংগ্রামী নারী স্তব্ধ হলেন ঢাকার সড়কে।
- 🔴 থানা পুলিশের উদাসীনতা: ঘটনাস্থলটি মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানার সীমানায় হওয়ায় দুই থানার ওসির দাবি—তাঁরা এই বিষয়ে কিছুই ‘অবগত নন’।
- 🟡 আইনি ফাঁকফোকর: ময়নাতদন্ত (Autopsy) ছাড়া দাফন সম্পন্ন হওয়ায় পরবর্তীতে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত প্রমাণ (Medical Evidence) উপস্থাপন করা জটিল হতে পারে।
- 🔵 সামাজিক উদাসীনতা: দুর্ঘটনার পর রক্তাক্ত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ সাহায্য চাইলেও শুরুতে কোনো পথচারী বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এগিয়ে আসেনি।
🏍 একাই লড়েছিলেন দেড় দশক: যেভাবে থমকে গেল জীবন
পারিবারিক অনুষ্ঠান শেষে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেয়ে সোমাইয়াকে নিয়ে ৭ জুন ভোর ৫টায় গাবতলীতে নামেন সোহেলী। কিছুটা আলো ফোটার পর ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে ধানমন্ডির বাসার উদ্দেশে রওনা হন।
সকাল সোয়া ৬টায় রিকশাটি যখন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের গেটের কাছে পৌঁছায়, তখনই হেলমেট পরা দুই মোটরসাইকেল আরোহী পেছন থেকে সোহেলীর হাতব্যাগ ধরে তীব্র হ্যাঁচকা টান দেয়। গতি সামলাতে না পেরে রিকশা থেকে সড়ক বিভাজকে (Divider) আছড়ে পড়েন তিনি। মাথার পেছনের অংশ ফেটে কান দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, একই সঙ্গে ডান হাত ভেঙে যায়।
স্বজনদের আক্ষেপ: “প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। মেয়েটি অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছে, কিন্তু প্রথমে কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে রিকশাচালক ও একজন স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।”
— তরিকুল ইসলাম, সোহেলীর বোনের স্বামী।
টানা ৪ দিন ৩টি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর অবশেষে ১২ জুন (বৃহস্পতিবার) সকালে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নারী।
💔 অবর্ণনীয় এক জীবনসংগ্রামের নির্মম সমাপ্তি
সোহেলী ইসলাম সোমার জীবনটি সহজ ছিল না, ছিল এক অবিরাম লড়াইয়ের গল্প। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক (১৫ বছর) ধরে তিনি সমাজ ও বাস্তবতার সাথে একাই যুদ্ধ করছিলেন তাঁর একমাত্র কন্যাসন্তান সোমাইয়া আলমকে মানুষের মতো মানুষ করতে।
সোহেলীর ওপর নিয়তির আঘাত এখানেই শেষ হয়নি। বছর দুয়েক আগে তিনি হারান তাঁর বাবাকে, আর তার মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মারা যান তাঁর মা-ও। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পুরো পরিবারের সমস্ত মানসিক ও আর্থিক ভার একা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের এই লড়াকু কর্মকর্তা।
কিন্তু ঢাকার একটি ভোরের আলো ফুটতেই সেই ১৫ বছরের দীর্ঘ নিঃসঙ্গ সংগ্রাম, স্বপ্ন আর একটি মেয়ের আশ্রয় চিরতরে কেড়ে নিল দুই ছিনতাইকারীর একটি হিংস্র হ্যাঁচকা টান। মৃত্যুর পর এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর একমাত্র মেয়ে সোমাইয়া আলম, যিনি বর্তমানে স্নাতক (অনার্স) পড়ছেন। মা-বাবা-নানা-নানি সবাইকে হারিয়ে মেয়েটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার ও অনিশ্চিত।
⚖ দুই থানার সীমানায় জিম্মি ন্যায়বিচার
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কটি মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর—এই দুই থানার সীমানা প্রাচীর। আর এই সীমানার মারপ্যাঁচেই আটকে গেছে অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া।
- মোহাম্মদপুর থানা: ওসি মেজবাহ উদ্দিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ধরণের কোনো ঘটনার বিষয়ে তিনি ‘অবগত নন’।
- শেরেবাংলা নগর থানা: ওসি মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “সংবাদমাধ্যমে মৃত্যুর খবর দেখার পর আমরা খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রকৃতপক্ষে কোথায় ও কীভাবে ঘটেছে তা জানার চেষ্টা চলছে।”
- পার্বতীপুর থানা (দিনাজপুর): ওসি আব্দুল ওয়াদুদ মৃত্যুর খবর শুনলেও থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ না আসার কথা জানিয়েছেন।
📊 যা নিশ্চিত, যা অনিশ্চিত ও যা তদন্তাধীন
✅ নিশ্চিত ও যাচাইকৃত তথ্য:
১. নিহতের পরিচয়, পেশা এবং ১৫ বছরের একলা জীবনসংগ্রামের তথ্য নিশ্চিত।
২. ঘটনার সময়, স্থান এবং ছিনতাইয়ের ধরন একাধিক সূত্রে প্রমাণিত।
৩. ৩টি হাসপাতাল ঘুরে ৪ দিন পর মৃত্যু এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন সম্পন্ন।
❓ ধোঁয়াশা ও তথ্যের অমিল (সংবাদমাধ্যম ভেদে):
১. ভ্রমণের কারণ: ‘প্রথম আলো’ বলছে পারিবারিক অনুষ্ঠান, ‘আমার দেশ’ বলছে বিয়ের দাওয়াত, এবং ‘বিডিনিউজ২৪’ বলছে ঈদের ছুটি।
২. সিসিটিভি ফুটেজ: ঘটনাস্থলের বা হাসপাতালের গেটের সিসিটিভি সচল ছিল কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।
🔍 যা তদন্ত হওয়া জরুরি:
১. সীমানার অজুহাতে দুই থানার নিষ্ক্রিয়তার পেছনে আইনি গাফিলতি কতটুকু?
২. ময়নাতদন্ত না হওয়ায় অপরাধীদের ‘কজ অব ডেথ’ (Cause of Death) নিয়ে আইনি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো কিনা?
⚖ চূড়ান্ত মূল্যায়ন
সোহেলী ইসলাম সোমার এই মৃত্যু কেবল একটি ‘ছিনতাইয়ের দুর্ঘটনা’ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয়, আইনি ও সামাজিক কাঠামোর এক চরম এবং লজ্জাজনক ব্যর্থতা। যে নারী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একলা হাতে সমস্ত ঝড়ঝাপটা সামলে একটি সন্তানকে বড় করে তুলছিলেন, রাষ্ট্র তাঁকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারেনি। অপরাধ করার পর অপরাধীরা বীরদর্পে পালিয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী পরিবারকে মরদেহের ময়নাতদন্ত করার মানসিক শক্তিটুকু হারানোর পর বলা হয়—”থানায় তো কেউ অভিযোগ করেনি।”
যদি কোনো পরিবার শোকের ধাক্কায় বা আইনি হয়রানির ভয়ে তাৎক্ষণিক মামলা করতে না-ও পারে, তবে কি রাষ্ট্রের বা পুলিশের কোনো স্বতঃপ্রণোদিত দায়িত্ব থাকে না? একটি জনবহুল হাসপাতালের প্রধান ফটকে নিয়মিত পুলিশ টহল থাকার পরও এই ধরণের অপরাধ এবং পরবর্তীতে দুই থানার ‘অবগত নই’ বুলি মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। স্বজনরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন, তবে ততক্ষণে অপরাধীদের আলামত নষ্ট করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার দায়ভার ঢাকার পুলিশ প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
📋 সংখ্যায় ঘটনার ক্রোনোলজি (এক নজরে)
- 🗓 ০৬ জুন ২০২৬: দিনাজপুর থেকে মেয়ের হাত ধরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা।
- 🗓 ০৭ জুন ২০২৬ (সকাল সোয়া ৬টা): সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে ছিনতাই ও গুরুতর জখম।
- 🗓 ১২ জুন ২০২৬ (সকাল): ৪ দিন লড়াই শেষে হাসপাতালে মৃত্যু ও বিকেলে ঈশ্বরদীতে দাফন।
- 🗓 ১৩ জুন ২০২৬: ঘটনার ৬ দিন পার হলেও দুই থানায় কোনো এফআইআর (FIR) হয়নি।



