Homeটুডে স্পোর্টসবিদায়, লিও: যে ছেলেটিকে একদিন আর্জেন্টিনা চিনতেই পারেনি

বিদায়, লিও: যে ছেলেটিকে একদিন আর্জেন্টিনা চিনতেই পারেনি

রোসারিওর অচেনা কিশোর থেকে আকাশী-সাদা জার্সির সবচেয়ে বড় প্রতীক—দুই দশকের অভিমান, কান্না, প্রত্যাবর্তন আর বিশ্বজয়ের পর আজ মনুমেন্টালে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি

TODAY SPORTS | বুয়েনস এইরেস | ৬ অক্টোবর ২০২৬


আজকের রাতটা আর পাঁচটা রাতের মতো নয়

অদ্ভুত এক শূন্যতার আভাস যেন সকাল থেকেই ছড়িয়ে আছে বুয়েনস এইরেসে। স্টেডিয়ামের বাইরে পতাকা উড়ছে, আকাশী-সাদা জার্সিতে শহর ভরে উঠছে। কেউ হাতে মেসির ১০ নম্বর, কেউ ২০১৪-এর ছবি, কেউ ২০২২-এর বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তাঁর সেই বিখ্যাত উল্লাসের ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু এই উৎসবের ভেতরেও কোথাও একটা বিষাদ জমে আছে।

কারণ আজ, ৬ অক্টোবর ২০২৬, আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ। বেনিনের বিপক্ষে বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মনুমেন্টালে আজ যে মানুষটি মাঠে নামবেন, তিনি আর শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি এখন একটি দেশের ফুটবল-স্মৃতির সবচেয়ে বড় অংশ।

ফিফা নিশ্চিত করেছে, বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচই আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ উপস্থিতি। গত আগস্টে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। বয়স তখন ৩৯। আজ তাই ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি দৃশ্য—শেষবারের মতো আকাশী-সাদা জার্সি পরে মেসির মাঠে নামা।

কিন্তু গল্পটা এখানে শুরু হয়নি

আজ মনুমেন্টালে যে মানুষটির জন্য ৮৫ হাজার মানুষের চোখ অপেক্ষা করছে, একদিন সেই মানুষটিকেই খুঁজে পেতে হিমশিম খেয়েছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগে তিনি ছিলেন অনেকটা আর্জেন্টিনার চোখের আড়ালে বেড়ে ওঠা এক রত্ন।

রোসারিওতে জন্ম, শৈশবেই স্পেনে পাড়ি, তারপর বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠা—মেসির ফুটবলীয় কৈশোর কেটেছে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কাঠামোর বাইরে। তাঁকে জাতীয় দলে পাওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়াটিও ছিল জটিল। তাঁর নাম নিয়েও ভুল হয়েছিল, তাঁকে নিয়ে অনেকে জানতেন না, আর স্পেনে বড় হওয়ার কারণে আর্জেন্টিনার ফুটবল মহলের একাংশ তাঁকে নিজেদের ছেলে হিসেবেও তখন দেখত না।

আজ যে মনুমেন্টাল তাঁকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত, সেই গল্পের শুরুটা তাই ভালোবাসায় নয়—সন্দেহে।

ফিনল্যান্ডের সেই ম্যাচ, যে ম্যাচে একজন ‘ফাঁস’ করে দিয়েছিলেন মেসিকে

২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে খেলছিলেন সেস ফাব্রেগাস। মেসি তখন বার্সেলোনার একাডেমির সতীর্থ। আর্জেন্টিনার যুব দলের সদস্যরা তখনও জানতেন না, বার্সেলোনার সেই ছোট্ট বাঁ-পায়ের ছেলেটি ভবিষ্যতে কী হতে চলেছেন।

ফাব্রেগাসের কাছ থেকে মেসির কথা শুনে আর্জেন্টিনার ফুটবল কর্মকর্তাদের আগ্রহ তৈরি হয়। তারপর শুরু হয় তাঁকে জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। কিন্তু সেই অনুসন্ধানেও ছিল অদ্ভুত ভুলভ্রান্তি। নামের বানান, পরিচয়, পরিবার—সবকিছু মিলিয়ে এএফএর কাছে মেসি যেন একটি ধাঁধা।

কখনও Lionel-এর বদলে Leonardo, কখনও Messi-র বদলে অন্য বানান। আজ শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে। কারণ আজ আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই যেখানে মেসি, সেখানে একসময় তাঁকেই খুঁজে পাওয়া ছিল অভিযানের মতো।

২০০৫: যে অভিষেক মাত্র ৪৭ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিল

১৭ আগস্ট ২০০৫। হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক। ১৮ বছরের মেসি দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামলেন। আর মাত্র ৪৭ সেকেন্ড পরই লাল কার্ড। একটি হাতের সংঘর্ষ, একটি ভুল মুহূর্ত, আর স্বপ্নের অভিষেক পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে।

আজকের মেসিকে সামনে রেখে সেই মুহূর্ত কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই—কখনও কখনও কিংবদন্তির গল্প শুরু হয় এমন একটি অধ্যায় দিয়ে, যেটি আপনি মুছে ফেলতে চাইবেন।

২০০৬: বিশ্বকাপে প্রথম পা, প্রথম গোল

এক বছরও কাটেনি। মেসি উঠে গেলেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে নামলেন ১৮ বছর বয়সী মেসি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাসিস্ট করলেন, তারপর নিজেই গোল করলেন।

সেই গোল তাঁকে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করা সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়দের একজন করে দেয়। বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কও সেদিনই শুরু। কিন্তু সেই বিশ্বকাপও সুখে শেষ হয়নি। জার্মানির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। মেসি তখনও কিশোর।

যে মানুষটি দেশের জার্সিতে ‘পেচো ফ্রিও’ হয়ে গেলেন

বার্সেলোনায় মেসি তখন একের পর এক রেকর্ড ভাঙছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর গল্প ছিল অন্যরকম। দেশে অনেকের মনে হয়েছিল—এই ছেলেটির মধ্যে বার্সেলোনার সেই আগুন নেই। মেসির বিরুদ্ধে উঠেছিল অভিযোগ, তিনি নাকি খুব ঠান্ডা, দেশের জন্য যথেষ্ট আবেগ দেখান না।

আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভাষায় তাঁকে বলা হতে লাগল—‘পেচো ফ্রিও’, অর্থাৎ ঠান্ডা বুকের মানুষ। আজকের দিনের মেসির সঙ্গে সেই পরিচয় মিলিয়ে দেখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু একটা সময় তাঁকে সেই পরিচয় ভেঙে ফেলতে হয়েছিল। নিজের মাঠে, নিজের দেশের মানুষের কাছে।

২০১৪: অশ্রুসিক্ত গোল্ডেন বল, কিন্তু অধরা ট্রফি

ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি আর্জেন্টিনাকে টেনে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। চার গোল, একাধিক ম্যাচসেরা পুরস্কার, আর শেষে গোল্ডেন বল। কিন্তু মারাকানার ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মুখে হতাশা। হাতে গোল্ডেন বল। চোখে জল। কিন্তু সেই রাতেও আর্জেন্টিনার একটি অংশ তাঁকে ক্ষমা করেনি। মেসি বুঝেছিলেন, শুধু ফাইনালে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়। আর্জেন্টিনা চাইছে ট্রফি।

২০১৬: ‘আমি আর জাতীয় দলে খেলব না’

চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে হারের পর মেসি বললেন—তিনি জাতীয় দল ছাড়ছেন। যে মানুষটি শৈশবের শারীরিক সমস্যা, দেশ ছাড়ার কষ্ট, ইউরোপে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই পেরিয়েছিলেন, সেই মানুষটি এবার নিজের দেশকে বললেন—বিদায়।

কিন্তু সেই বিদায়ই বদলে দিল সম্পর্ক। আর্জেন্টিনা এবার বুঝতে শুরু করল—তারা মেসিকে হারাতে বসেছে। সমালোচনার জায়গায় এল অনুরোধ, অভিযোগের জায়গায় এল ভালোবাসা। ফিরে এল মেসি।

আর সেই প্রত্যাবর্তন থেকেই শুরু হলো সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

স্কালোনি এলেন, বদলে গেল আর্জেন্টিনা

২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর লিওনেল স্কালোনির হাতে দায়িত্ব যায়। তখন তাঁকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিল না সবাই। কিন্তু স্কালোনি আর মেসির যুগলবন্দি আর্জেন্টিনার ইতিহাস বদলে দিল।

প্রথমে ২০২১ কোপা আমেরিকা। ব্রাজিলের মারাকানা। নেইমারের ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-০ জয়। ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেসির জাতীয় দলের প্রথম বড় ট্রফি।

সেই রাতে হয়তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছিল ট্রফির ঘরে নয়—আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয়ে। তারা অবশেষে মেসিকে নিজেদের করে নিয়েছিল।

২০২২: যে রাতে সব হিসাব মিটে গেল

তারপর কাতার। শুরুতেই সৌদি আরবের কাছে হার। আবার প্রশ্ন। আবার সংশয়। কিন্তু এরপর মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া। আর তারপর ফ্রান্স।

লুসাইলের সেই ফাইনাল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। মেসি দুই গোল করলেন। এমবাপ্পে করলেন হ্যাটট্রিক। ৩-৩ সমতা। তারপর পেনাল্টি। আর্জেন্টিনা জিতল। মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ।

আর সেই মুহূর্তেই হয়তো ‘পেচো ফ্রিও’ শব্দটি চিরতরে কবর দেওয়া হলো। কারণ মেসি শুধু ট্রফি দেননি; তিনি দিয়েছিলেন সেই আবেগ, যে আবেগের জন্য আর্জেন্টিনা এতদিন তাঁকে খুঁজেছিল।

২০২৪: কোপা আমেরিকার মুকুটে শেষ পালক

২০২১-এর পর ২০২৪। আবার কোপা আমেরিকা। আবার মেসির নেতৃত্ব। আর্জেন্টিনা আবারও চ্যাম্পিয়ন। এর ফলে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা—পরপর তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা আর্জেন্টিনার হাতে।

এটি শুধু মেসির সাফল্য নয়। এটি ছিল একটি প্রজন্মের পূর্ণতা।

২০২৬: শেষ বিশ্বকাপ, শেষ দৌড়

বয়স তখন ৩৯। শরীর আগের মতো নয়, পা আগের মতো দ্রুত নয়। কিন্তু ইচ্ছেটা? এখনো আছে।

মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেললেন তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। স্পেনের কাছে ফাইনালে ১-০ হেরে শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। স্পেন শুরু থেকে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছিল এবং ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে শিরোপা নিশ্চিত করে।

মেসির শেষ বিশ্বকাপও শেষ হলো কান্নায়। কিন্তু এই কান্না ২০১৪-এর কান্নার মতো ছিল না। কারণ এবার তাঁর পাশে ছিল পুরো আর্জেন্টিনা।

তারপর এল আরেকটি শূন্যতা

বিশ্বকাপের পর মেসির বাবা হোর্হে মেসি মারা যান আগস্টে, ৬৮ বছর বয়সে। হোর্হে ছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিনের মানুষ। বার্সেলোনায় মেসির পথচলার শুরু থেকে তিনি ছেলে লিওনেলের পাশে ছিলেন এবং দীর্ঘদিন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন।

বাবার মৃত্যুর পর মেসি জানিয়েছিলেন, ফুটবল চালিয়ে যাবেন কি না তা নিয়েও তাঁর মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। যে মানুষটি এতদিন বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ফুটবলের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছেন, তাঁর কাছে হঠাৎ করে সেই পথটি আরও ফাঁকা হয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত এল। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর।

৩১ আগস্ট ২০২৬-এ মেসি জানান, সময় এসেছে সরে দাঁড়ানোর। তিনি সবকিছু দিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর মনে হয়েছে নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে।

আর আজ—মনুমেন্টালের রাত

আজ ৬ অক্টোবর। এস্তাদিও মনুমেন্টাল। সামনে বেনিন। ৮৫ হাজার মানুষ। এই ম্যাচটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়; এটি একটি বিদায়ী অনুষ্ঠান।

আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের এবং তাঁদের পরিবারকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। টিকিট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। শহরের চারপাশে মেসিকে ঘিরে আয়োজন চলছে।

গতকাল শেষবারের মতো জাতীয় দলের অনুশীলনে মেসিকে হাসতে, সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলতে এবং বল নিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে অনুশীলন করতে দেখা গেছে। শেষ অনুশীলনেও তাঁর মধ্যে বিষণ্ণতার বদলে ছিল হাসি-ঠাট্টা ও পরিচিত স্বাভাবিকতা।

এটাই হয়তো মেসির সবচেয়ে সুন্দর দিক। তিনি বিদায়কে শোকসভা বানাতে চান না।

কোটি মানুষের চোখে যে ছেলে আজও সেই কিশোর

আজ মাঠে নামার সময় মেসি হয়তো মনে রাখবেন না তাঁর ২০৭তম ম্যাচের হিসাব। মনে রাখবেন না ১২৫ গোলের সংখ্যা। মনে রাখবেন না ৬৮টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড।

হয়তো তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে অন্য কিছু—রোসারিও, বাবা হোর্হে, মা সেলিয়া, বার্সেলোনার সেই ছোট্ট ঘর, লা মাসিয়া, হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৪৭ সেকেন্ডের লাল কার্ড, ২০০৬-এর প্রথম বিশ্বকাপ গোল, ২০১৪-এর কান্না, ২০১৬-এর বিদায়, ২০২১-এর মারাকানা, ২০২২-এর লুসাইল।

আর তারপর—বিশ্বকাপ হাতে মেসি।

একজন ফুটবলারের সঙ্গে একটি দেশের সম্পর্কের গল্প

ম্যারাডোনাকে আর্জেন্টিনা ভালোবেসেছিল প্রায় প্রথম দিন থেকেই। মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম। প্রথমে তাঁকে পরীক্ষা করা হয়েছে। তারপর প্রশ্ন করা হয়েছে। তারপর তাঁকে দোষ দেওয়া হয়েছে।

তিনি যখন চলে যেতে চাইলেন, তখন তাঁকে ধরে রাখা হয়েছে। আর শেষে তিনি যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেন, তখন দেশটি তাঁকে এমনভাবে গ্রহণ করল, যেন বহু বছর পর ফিরে পাওয়া কোনো হারানো সন্তান।

আর্জেন্টিনার মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল যেন এক হারানো সন্তানকে ধীরে ধীরে চিনে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলা।

মেসি চলে যাবেন, কিন্তু ‘১০’ কোথায় যাবে?

এখন আরেকটি অধ্যায় শুরু হবে। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার হাতে যাবে?

নামের তালিকায় উঠে আসছে নিকো পাজ ও ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়ানোর মতো তরুণদের নাম। কিন্তু মেসির ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ১০ নম্বর পরা আর কেবল একটি জার্সি পরা নয়—এটি প্রায় একটি দায়িত্ব বহন করা।

আর FIFA নিয়মের কারণে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মেসির ১০ নম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর দেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ জার্সিটি থাকবে। কেউ না কেউ একদিন পরবে। কিন্তু মেসির ১০ আর কোনো দিনই কেবল ১০ থাকবে না।

মেসির পরিসংখ্যান এক পাশে, মানুষের মেসি অন্য পাশে

আন্তর্জাতিক ম্যাচ: ২০৭
আন্তর্জাতিক গোল: ১২৫
আন্তর্জাতিক অ্যাসিস্ট: ৬৮
বিশ্বকাপ: ৬টি
বিশ্বকাপ শিরোপা: ১টি, ২০২২
কোপা আমেরিকা: ২০২১, ২০২৪
অলিম্পিক স্বর্ণ: ২০০৮
ফাইনালিসিমা: ২০২২
ব্যালন ডি’অর: ৮টি

এই সংখ্যা ইতিহাসের অংশ। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার সংখ্যার বাইরে।

একটি প্রজন্ম তাঁকে দেখে ফুটবল শিখেছে। একটি শিশু তাঁর বাঁ পায়ের ড্রিবল দেখে মাঠে নেমেছে। একজন তরুণ তাঁর ২০১৬-এর কান্না দেখে বুঝেছে, ব্যর্থতার পরও ফিরে আসা যায়। একজন বাবা তাঁর ছেলের সঙ্গে ২০২২-এর ফাইনাল দেখেছেন।

আর লাখো আর্জেন্টাইন তাঁকে দেখে শিখেছে—অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও স্বপ্নের বয়স শেষ হয় না।

শেষ ট্যাঙ্গো

হয়তো আজ মনুমেন্টালে মেসি গোল করবেন। হয়তো করবেন না। হয়তো দল জিতবে। হয়তো রাতটা কেবল স্মৃতির হবে। কিন্তু তাতে আর কিছু যায় আসে না।

কারণ আজকের ম্যাচের ফল মেসির গল্পের মাপকাঠি হতে পারে না। তাঁর গল্পের মাপকাঠি হলো সেই পথ, যেখানে একসময় নিজের দেশই তাঁকে চিনত না; আর আজ সেই দেশই ৮৫ হাজার মানুষ নিয়ে তাঁর বিদায়ের অপেক্ষায় বসে আছে।

একসময় তাঁকে বলা হয়েছিল—তিনি যথেষ্ট আর্জেন্টাইন নন। আজ তাঁর বিদায়ের দিনে প্রশ্নটা অন্যরকম—আর্জেন্টিনা কি কখনো মেসি ছাড়া নিজেকে একইভাবে চিনতে পারবে?

হয়তো পারবে। ফুটবল এমনই। একদিন সব মহানায়কের জায়গায় নতুন কেউ আসে। কিন্তু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও জায়গাটি পুরোপুরি খালি হয় না। মেসি তেমনই একজন।

আজ তিনি হয়তো শেষবারের মতো আকাশী-সাদা জার্সিতে মাঠে নামবেন। আজ হয়তো শেষবারের মতো মনুমেন্টাল তাঁর নামে গর্জে উঠবে। শেষবারের মতো বাঁ-পায়ের শিল্প দেখতে চোখ আটকে থাকবে হাজার হাজার মানুষের।

তারপর বাঁশি বাজবে। ম্যাচ শেষ হবে। একটি অধ্যায় সত্যিই শেষ হবে। কিন্তু মেসির গল্প? সেটি শেষ হবে না।

কারণ কিছু ফুটবলার খেলা শেষ করে যান। আর কিছু ফুটবলার ফুটবলকে বদলে দিয়ে যান।

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি তাঁদেরই একজন।

বিদায়, লিও।

বিদায় সেই ছেলেটিকে, যে একদিন নিজের দেশেই ছিল অচেনা।

বিদায় সেই অধিনায়ককে, যে একদিন কান্নায় জাতীয় দল ছাড়তে চেয়েছিল।

বিদায় সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে, যে শেষ পর্যন্ত আকাশী-সাদা জার্সিতে নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করে নিয়েছিল।

আজ হয়তো চোখে জল থাকবে। কিন্তু তার ভেতরেই থাকবে এক অদ্ভুত শান্তি। কারণ এইবার মেসি যাচ্ছেন অপূর্ণতার বোঝা নিয়ে নয়।

যাচ্ছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে।

আর আর্জেন্টিনার মানুষ তাঁকে বিদায় জানাবে সমালোচক হিসেবে নয়—

নিজেদের একজন হিসেবে।

তথ্যসূত্র

FIFA — Lionel Messi Argentina farewell, Argentina career, World Cup career and 2026 World Cup final report
Reuters — Messi farewell closes a long, hard-won love story with Argentina; Lionel Messi retirement report; Jorge Messi death report
Al Jazeera — Lionel Messi’s Argentina farewell and final match vs Benin
EFE — Argentina national team’s final training ahead of Messi farewell
Folha de S.Paulo — Argentina’s post-Messi No. 10 discussion

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments