Homeটুডে নেশনএক লাফে লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম, কেন এমন সিদ্ধান্ত?

এক লাফে লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম, কেন এমন সিদ্ধান্ত?

আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, বিপিসির বড় লোকসান ও পাচারের ঝুঁকি—একসঙ্গে কয়েকটি কারণ দেখাচ্ছে সরকার; পরিবহন, পণ্য উৎপাদন ও জীবনযাত্রার খরচে নতুন চাপের আশঙ্কা

ঢাকা | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন

রোববার রাতে অনেকটা আকস্মিকভাবেই জ্বালানি তেলের চারটি প্রধান পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা আসে। সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। অর্থাৎ একবারে সব ধরনের তেলের দামই ২০ টাকা করে বেড়েছে।

দাম বাড়ানোর খবর প্রকাশের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে বাড়তি ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। একই সময়ে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পণ্য পরিবহন, উৎপাদন, বাজারদর ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ঠিক কী ঘটেছে? কেন কয়েক মাস দাম অপরিবর্তিত রাখার পর হঠাৎ এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানো হলো? আর এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পড়তে পারে—এসব প্রশ্নই এখন সামনে।

আন্তর্জাতিক বাজারে কী ঘটছে

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে মার্চ থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনে জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে একই পরিমাণ তেল কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর আমদানি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, মার্চের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

অর্থাৎ দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে শুধু দেশীয় সিদ্ধান্ত নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বড় ধরনের অস্থিরতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বিপিসির লোকসান কত

দাম না বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের ওপর চাপ ধরে রাখার আর্থিক বোঝাটিও বড় হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছে সরকার। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ছয় মাসে এ লোকসানের গড় দাঁড়ায় মাসে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ টনই ডিজেল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের তুলনায় দেশের বাজারে ডিজেল কম দামে বিক্রি হওয়ায় প্রতি লিটারে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল।

সরকারের হিসাব বলছে, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও ডিজেলের ক্ষেত্রে বিপিসিকে কিছু ঘাটতি বহন করতে হবে। তবে আগের দামের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ কমবে। দাম সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান বা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।

শুধু লোকসান নয়, পাচারের আশঙ্কার কথাও বলছে সরকার

দাম বাড়ানোর আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি দামের পার্থক্য তুলে ধরেছে সরকার।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মূল্য সমন্বয়ের আগে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। একই সময়ে কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, মিয়ানমারে প্রায় ১৬৪ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৭৯ টাকা। এ কারণে সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

সরকারের যুক্তি হলো, বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করা জ্বালানি যদি কম দামের কারণে পাচার হয়ে যায়, তাহলে একদিকে দেশের বাজারে চাপ বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রারও অপচয় হবে। নতুন মূল্য কাঠামোর মাধ্যমে সেই ব্যবধান কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে পাচারের প্রকৃত পরিমাণ বা এর কারণে ঠিক কত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে—এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত পরিমাণগত তথ্য দেওয়া হয়নি।

তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কোথায়?

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে পরিবহনে। কারণ ডিজেলভিত্তিক বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশের পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে জ্বালানি সরাসরি যুক্ত।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং শহরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত ওই নতুন ভাড়া চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। বিআরটিএর প্রস্তাব অনুযায়ী, বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার কথা রয়েছে।

এরই মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দূরপাল্লার কিছু রুটেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এতে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, অনুমোদিত ভাড়া বাড়ার আগেই যদি পরিবহন খাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তি টাকা নেওয়া শুরু হয়, তাহলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

বাজারে জ্বালানির প্রভাব কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে

জ্বালানি তেল শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাস চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয় না। কৃষিতে সেচ, পণ্য পরিবহন, শিল্পকারখানার উৎপাদন, নির্মাণকাজ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু অংশ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও এর ব্যবহার রয়েছে।

একটি পণ্য কৃষকের জমি থেকে বাজারে, সেখান থেকে পাইকারি আড়ত এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে পৌঁছাতে একাধিকবার পরিবহন করতে হয়। প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পণ্য পরিবহন মালিকদের সংগঠন ইতোমধ্যে বলেছে, জ্বালানির বাড়তি দাম ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভারের পরিচালন ব্যয় বাড়াবে। এর প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতে হতে পারে।

মূল্যস্ফীতির সময়ে বাড়তি চাপ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগের মাস জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে নতুন করে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা যেমন সরাসরি তেলের দাম বাড়াচ্ছে, তেমনি দেশের ভেতরে তেলের বাড়তি দাম অন্যান্য পণ্যের মূল্যেও দ্বিতীয় দফা চাপ তৈরি করতে পারে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সঙ্গে নতুন চাপ

দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এমনিতেই স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে।

জুলাইয়ে শিল্পমালিকেরা জানিয়েছেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর চালাতে বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘাটতি ছিল। সেপ্টেম্বরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ঢাকাতেও লোডশেডিং বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।

অর্থাৎ একই সময়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি—তিনটি খাতেই বাড়তি চাপ থাকায় নতুন তেলের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা উভয়ের জন্যই আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন এত ক্ষোভ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পেশার মানুষ পরিবহন ব্যয় ও সংসারের খরচ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রকাশিত জনমতভিত্তিক প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ উঠে এসেছে।

প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতাকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে সংগঠনের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ভোক্তা সংগঠন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ থাকলেও এর পুরো বোঝা একসঙ্গে ভোক্তার ওপর দিলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নিজস্ব অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সরকারের বক্তব্য কী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং জাহাজভাড়া বাড়ার কারণে মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যকর বিকল্প ছিল না। তিনি এটিকে সহজ বা জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না বলেও জানিয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রীর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে দামের পার্থক্য এত বেশি হয়ে গিয়েছিল যে বিপিসিকে বড় অঙ্কের লোকসান বহন করতে হচ্ছিল। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি এবং জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকির বিষয়ও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হয়েছে।

সরকার আরও বলছে, জ্বালানি খাতে সীমাহীন ভর্তুকি দিতে থাকলে রাষ্ট্রের অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবামূলক কর্মসূচিতেও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর অভিঘাত কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

সামনে আসল পরীক্ষা কোন জায়গায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে মূলত আমদানি ব্যয় ও বিপিসির আর্থিক চাপ সামাল দিতে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাড়তি ব্যয়ের কতটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে যাবে এবং বাজারে তা কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।

পরিবহন ভাড়া চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সরকারকে যেমন যাত্রীদের সক্ষমতা বিবেচনা করতে হচ্ছে, তেমনি পণ্য পরিবহন খরচ বাড়লে কৃষি, শিল্প ও বাজারদরের ওপর তার প্রভাবও নজরে রাখতে হবে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বাড়তি খরচের কথা বলা হয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ভবিষ্যতে কমলে দেশের বাজারে সেই সুবিধা কত দ্রুত প্রতিফলিত হবে। কারণ বর্তমানে যে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় কাঠামো রয়েছে, তার উদ্দেশ্যই হলো আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের জ্বালানির দাম সমন্বয় করা। ২০২৪ সাল থেকে এই কাঠামোর আওতায় নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

ক্ষোভ থেকে কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, পরিবহন ভাড়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে—এগুলো এখনকার দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আন্দোলন বা অস্থিরতায় রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্তটির প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আগামী দিনগুলোতে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শেষ পর্যন্ত এই মূল্যবৃদ্ধির সাফল্য শুধু বিপিসির লোকসান কমল কি না, তা দিয়ে মাপা হবে না; একই সঙ্গে দেখতে হবে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে কি না, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা বজায় থাকছে কি না এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয় কতটা সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছে। এই ভারসাম্যই এখন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইত্তেফাক, যুগান্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মূল্যস্ফীতির তথ্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments