Homeশোবিজ টুডেশাকিরার বাংলাদেশ: গ্ল্যামারের পেছনে এক মর্মস্পর্শী মানবিক গল্প

শাকিরার বাংলাদেশ: গ্ল্যামারের পেছনে এক মর্মস্পর্শী মানবিক গল্প

ওয়াকা ওয়াকা আর লা লা লা—ফুটবল বিশ্বকাপের এই গানগুলো যখন গমগম করে ওঠে, তখন বিশ্ববাসী চেনে শাকিরাকে। ল্যাটিন পপের এই তারকা যখন মাঠে নড়েচড়ে বসেন, তখন তাঁর উচ্ছ্বাস আর গ্ল্যামার ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। কিন্তু এই গ্ল্যামারের আড়ালে শাকিরার আরেকটি পরিচয় আছে, যা অনেকেরই অজানা—জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিনি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছিলেন, দেখেছিলেন মানুষের কান্না, শুনেছিলেন শিশুদের বেদনার গান।


২০০৭: যখন সিডর কাঁদিয়েছিল বাংলাদেশ

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। ২৫০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এই ঝড়ের গতিবেগ ছিল ১৫৫ মাইল প্রতি ঘণ্টা, সঙ্গে ছিল ১৬ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় লক্ষাধিক ঘরবাড়ি, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় গোটা গ্রাম। প্রাণ হারান প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ, আরও দেড় হাজারের বেশি নিখোঁজ। প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ হয়ে পড়েন বিপর্যস্ত।

ঠিক এই দুর্যোগের মাঝেই বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। ইউনিসেফের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তাঁর বাংলাদেশ সফর আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সিডরের ভয়াবহতা দেখে তিনি সফর এগিয়ে আনেন। ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাত ১২টার দিকে তিনি ঢাকায় পৌঁছান—সঙ্গে ছিলেন মাত্র চারজন।

পটুয়াখালী: যেখানে ভেঙে পড়েছিলেন শাকিরা

ঢাকায় না থেমে শাকিরা ছুটে যান পটুয়াখালীর মিরাজগঞ্জে। সিডার-বিধ্বস্ত এই এলাকায় ইউনিসেফের ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস’—যেখানে দুর্যোগে আহত শিশুরা খেলতে ও শিখতে পারত—পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে তিনি পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণসামগ্রী ও শীতবস্ত্র বিতরণে অংশ নেন।

ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের আলিঙ্গন করে শাকিরা বলেছিলেন, “আমি দুঃখিত তোমাদের যা হয়েছে তার জন্য… তবে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমাদের সাহস আর ধৈর্যের প্রশংসা করি”।

নিপা: সেই কণ্ঠ যা শাকিরা ভোলেননি

সফরের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তটি ছিল ১১ বছর বয়সী নিপার সঙ্গে সাক্ষাৎ। সিডরে মা-বাবাকে হারানো এই মেয়েটি শাকিরাকে একটি বাংলা গান শুনিয়েছিল। গানের অর্থ ছিল—”মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো”। সেই কণ্ঠ তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না, পরে বলেছিলেন শাকিরা।

তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তিনি দেখেছিলেন আশার আলো। আধা-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলে শিশুরা খেলছে, গাইছে, হাসছে—এই দৃশ্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, “এই দুর্যোগ, দুঃখ আর শোকের মাঝে আমি এই আধা-ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলটিতে বাচ্চাদের খেলতে, গাইতে আর হাসতে দেখেছি… তাদের সবারই ইতিবাচক স্বপ্ন ছিল”।

রাজশাহী: দুর্গম শিশুদের সঙ্গে

পটুয়াখালী শেষে শাকিরা যান রাজশাহীতে। সেখানে তিনি ইউনিসেফের ‘দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের জন্য মৌলিক শিক্ষা’ প্রকল্প পরিদর্শন করেন। রাস্তার পাশে কাজ করা শিশুরা যেখানে শিক্ষাcentre-এ দিন কাটায়, সেখানে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।

শিশুদের প্রতি শাকিরার অঙ্গীকার

শাকিরা ২০০৩ সালে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী এবং প্রথম কলম্বিয়ান যিনি এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

তবে তার এই মানবিক মনোভাবের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল অনেক আগে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ‘পিয়েস দেসকালসোস’ (খালি পা) ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘খালি পা’—কলম্বিয়ার দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়াই ছিল এর লক্ষ্য। বর্তমানে এই ফাউন্ডেশনের পাঁচটি স্কুলে প্রায় ৪ হাজার শিশু শিক্ষা ও খাবার পায়।

আর এই অনুপ্রেরণার বীজ রোপিত হয়েছিল শাকিরার বয়স যখন মাত্র আট বছর। তার বাবা দেউলিয়া হয়ে যান, পরিবার প্রায় সবকিছু হারায়। একদিন বাবা তাকে শহরের একটি পার্কে নিয়ে যান, যেখানে তিনি দেখেন এতিম শিশুরা ক্ষুধা মেটাতে আঠা শুঁকছে। সেই দৃশ্য তাকে নাড়া দিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “সেই মুহূর্ত থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে একদিন আমি তাদের সাহায্য করার জন্য কিছু করব”।

বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণে শাকিরা

বাংলাদেশ সফর শেষে শাকিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সিডরে প্রায় ৩ হাজার স্কুল ধ্বংস হয়েছে, এবং বিশ্বকে এগিয়ে আসা উচিত। “স্কুলগুলোই একমাত্র জায়গা যেখানে শিশুরা তাদের জীবনের দুঃখের মুহূর্তগুলো ভুলে খুশি হতে পারে”—বলেছিলেন তিনি。

এক মা শাহনাজ শাকিরাকে জানিয়েছিলেন, কীভাবে তাঁর সন্তানরা তাঁর কোলে মারা গিয়েছিল সিডরের জলোচ্ছ্বাসে। শাকিরা বলেছিলেন, “আমি কখনো ভুলব না মায়েদের মুখ, যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, আর শিশুদের মুখ, যারা তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছেন”।

গ্ল্যামারের পেছনের মানুষটি

শাকিরার এই বাংলাদেশ সফর ছিল অনেকটাই আড়ালে। ইউনিসেফের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, প্রচার-প্রচারণার চেয়ে তিনি বাংলাদেশকে কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই সফরটি গোপন রাখা হয়েছিল।

আজ বিশ্বকাপের মাঠে যখন শাকিরার গানে মেতে ওঠে বিশ্ব, তখন হয়তো অনেকেই জানেন না—প্রায় দুই দশক আগে এই শাকিরাই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দুর্যোগপীড়িত শিশুদের গল্প শুনেছিলেন, তাদের সঙ্গে কেঁদেছিলেন, হেসেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে স্কুলগুলো ট্র্যাজেডির মাঝেও ‘মরুদ্যান’ হতে পারে—যেখানে শিশুরা কিছু সময়ের জন্য হলেও আবার শিশু হতে পারে।

শাকিরা যেমনটি বলেছিলেন, “শিশুরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠী, এবং একইসঙ্গে তারাই আমাদের নিরাপদ বিশ্বের একমাত্র আশা”। বাংলাদেশের সেই শিশুদের জন্য তাঁর চোখের জল আর হৃদয়ের স্পন্দন—এটাই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় গান, যা তিনি কখনো রেকর্ড করেননি, কিন্তু কখনো ভোলেননি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments