Homeটুডে হেলথনিরাপদ খাদ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং ‘সুপারবাগ’: উদ্বেগ কি শুধু খাদ্যে, নাকি পুরো...

নিরাপদ খাদ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং ‘সুপারবাগ’: উদ্বেগ কি শুধু খাদ্যে, নাকি পুরো ব্যবস্থায়?

শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার গবেষণা নতুন করে তুলছে খাদ্য নিরাপত্তা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন

মাহবুব কবির মিলন সাবেক অতিরিক্ত সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

ঢাকা | ১৬ জুন ২০২৬

সংকট কি শুধু হাসপাতালে, নাকি বাজারেও?

নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যে মাহবুব কবির মিলন প্রশ্ন তুলেছেন—বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কি ধীরে ধীরে একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে?

তাঁর মতে, সমস্যাটি শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার নয়; খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, ওষুধ বিক্রির সংস্কৃতি এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি দাবি করেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে এবং এ বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব রয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য

সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (PICU) পরিচালিত একটি গবেষণায় চিকিৎসকরা উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেছেন।

গবেষণায় চিকিৎসাধীন ৪৯ শিশুর নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিশুদের মধ্যে ব্যবহৃত অনেক প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী—

  • পরীক্ষিত ক্ষেত্রে প্রায় ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারিয়েছে
  • কিছু গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণু প্রধান ছয়টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ দেখিয়েছে
  • ইমিপেনেমে প্রতিরোধ ৯৬.৭%
  • মেরোপেনেমে প্রতিরোধ ৯৬.৪%
  • লেভোফ্লক্সাসিনে প্রতিরোধ ৮৪.২%

গবেষকদের মতে, বর্তমানে সীমিত কয়েকটি ওষুধ এখনো কার্যকর থাকলেও ভবিষ্যতে সেগুলোর কার্যকারিতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের জন্য শুধু খাদ্যকে দায়ী করা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি কারণকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে:

  • প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
  • কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা
  • পশুপালনে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
  • হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা
  • খাদ্য ও পরিবেশে জীবাণুর বিস্তার

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত Withdrawal Period অনুসরণ না করা হলে দুধ, মাংস বা অন্যান্য খাদ্যে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে বাজারের সব খাদ্যেই অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে—এমন সাধারণীকৃত দাবি গবেষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

জনস্বাস্থ্য নাকি নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা?

মাহবুব কবির মিলন তাঁর বক্তব্যে সরকারি তদারকি ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে।

তবে বিপরীত যুক্তিও রয়েছে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থা—যেমন:

  • বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA)
  • বিএসটিআই
  • ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর
  • প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর

বিভিন্ন সময় বাজার তদারকি, মোবাইল কোর্ট এবং খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—আইন থাকা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ কি একই বিষয়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি বেশি ঝুঁকিতে?

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—শিশুদের মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর উচ্চ উপস্থিতি।

গবেষকদের মতে, আগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা শিশুদের ক্ষেত্রে বহুঔষধ-প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে।

যদিও “শিশুরা জন্ম থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট হয়ে জন্মাচ্ছে”—এমন বক্তব্য এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে সাধারণ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তবে মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রমণ এবং ওষুধ ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে।

শেষ কথা

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা, ওষুধ ব্যবস্থাপনা এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ—তিনটি বিষয় এখন আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে আসছে।

একটি ছোট ভুল, একটি অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, অথবা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি দুর্বলতা—দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় মূল্য তৈরি করতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি শুধুই ব্যক্তিগত উদ্বেগের বিষয়, নাকি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও বড় আলোচনার সময় এসে গেছে?

তথ্যসূত্র: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গবেষণা তথ্য, WHO, CDC, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments