জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ধারাবাহিকতা, অস্ট্রেলিয়া-ইরানের অভিজ্ঞতা, আর জর্ডান-উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক অভিষেক—এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার গল্প অনেক বড়
ঢাকা | ১৪ জুন ২০২৬
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এশিয়া থেকে মোট ৯টি দল খেলছে। আটটি দল সরাসরি জায়গা করে নিয়েছে, আর ইরাক ৩১ মার্চের প্লে-অফ জিতে শেষ এশীয় স্লটটি পূর্ণ করেছে। এই নয়টি দল হলো: অস্ট্রেলিয়া, ইরান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, উজবেকিস্তান এবং ইরাক।
এশিয়ার এই প্রতিনিধিদলে অভিজ্ঞতা ও নতুনত্ব—দুটোরই মিশেল আছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ধারাবাহিকতা ও কাঠামোর দিক থেকে এগিয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচে ভরসার নাম, আর জর্ডান-উজবেকিস্তান-ইরাকের জন্য এবারের বিশ্বকাপ হচ্ছে ইতিহাস গড়া ও নিজেদের প্রমাণের মঞ্চ।
কতবার বিশ্বকাপে খেলেছে তারা
- অস্ট্রেলিয়া — ৭ বার। ফিফা বলছে, তারা সপ্তম বিশ্বকাপে খেলতে গেছে; ২০০৬ ও ২০২২-এ শেষ ষোলোয় ওঠাই এখন পর্যন্ত তাদের সেরা অর্জন।
- জাপান — ৮ বার। এটি জাপানের টানা অষ্টম বিশ্বকাপ; তারা ২০২২-এ জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে শেষ ষোলোর সীমা ছুঁয়েছিল, কিন্তু কখনও কোয়ার্টার ফাইনালে যায়নি।
- দক্ষিণ কোরিয়া — ১২ বার। এটি তাদের ১২তম বিশ্বকাপ এবং টানা ১১তম। তাদের সেরা ফল ২০০২ সালে চতুর্থ স্থান।
- ইরান — ৭ বার। এটি ইরানের সপ্তম বিশ্বকাপ এবং টানা চতুর্থ; তারা এখনো কখনও নকআউট পর্বে যেতে পারেনি।
- কাতার — ২ বার। ২০২২ সালে স্বাগতিক হিসেবে অভিষেকের পর এবারই প্রথম তারা বাছাই পেরিয়ে এসেছে; ফলে এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
- সৌদি আরব — ৭ বার। ফিফা এটি তাদের সপ্তম বিশ্বকাপ; ১৯৯৪ সালের শেষ ষোলোই এখনও তাদের সেরা সাফল্য।
- জর্ডান — ১ বার। এটি তাদের প্রথম বিশ্বকাপ; বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোই দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বিশাল অর্জন।
- উজবেকিস্তান — ১ বার। এটিও তাদের প্রথম বিশ্বকাপ, এবং আনুষ্ঠানিক অভিষেকের আগে কোচ হিসেবে এসেছেন ফাবিও ক্যানাভারো।
- ইরাক — ২ বার। শেষবার তারা খেলেছিল ১৯৮৬ সালে; এবার ৪০ বছর পর ফিরে এসেছে এবং এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণ
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার বড় শক্তি হলো লড়াইয়ের মানসিকতা। ফিফা ও রয়টার্স বলছে, তারা সপ্তম বিশ্বকাপে উঠেছে এবং ২০২২-এ শেষ ষোলোয় পৌঁছে নিজেদের সেরা সময়ের একটি দেখিয়েছে, যদিও রোস্টারে তারকার সংখ্যা খুব বেশি নয়। গ্রুপ ডি-তে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও প্যারাগুয়ের সঙ্গে পড়ায় কাজটা সহজ নয়, তবে রক্ষণশীল শৃঙ্খলা আর কাউন্টার-ফুটবল তাদের টিকে থাকার সুযোগ দিচ্ছে।
জাপান
এশিয়ার সবচেয়ে পরিণত দলগুলোর একটি এখনো জাপান। তারা বাছাইয়ে ৫৪ গোল করে মাত্র ৩ গোল হজম করেছে, আর এটি তাদের টানা অষ্টম বিশ্বকাপ। গ্রুপ এফ-এ নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও তিউনিসিয়ার সঙ্গে পড়লেও জাপানের সংগঠিত ফুটবল, দ্রুত ট্রানজিশন আর ইউরোপ-ভিত্তিক ফুটবলারদের গভীরতা তাদের নকআউট পর্বে যাওয়ার শক্ত দাবি তৈরি করে।
দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়া আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক নাম। ফিফা বলছে, এটি তাদের ১২তম বিশ্বকাপ, যার মধ্যে ১১টি টানা; ২০০২ সালে তারা চতুর্থ হয়েছিল। গ্রুপ এ-তে মেক্সিকো, চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তাদের লড়াই সহজ হবে না, কিন্তু সন হিয়ুং-মিন, লি কাং-ইন ও দলীয় শৃঙ্খলা তাদের শক্ত ভিত্তি দেয়।
ইরান
ইরান রিজার্ভ নয়, বরং নিয়মিত বিশ্বকাপপ্রার্থী। রয়টার্সের বিশ্লেষণে এটি তাদের সপ্তম এবং টানা চতুর্থ বিশ্বকাপ, কিন্তু এখনও তারা নকআউটের দরজা খুলতে পারেনি। গ্রুপ জি-তে বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ড থাকায় চ্যালেঞ্জ বড়, তবু মেহদি তেরেমি ও আলিরেজা জাহানবাখশ থাকলে ইরান যে কাউকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
কাতার
২০২২ সালে স্বাগতিক হিসেবে যে অভিষেক হয়েছিল, এবার কাতার সেখানে পা রাখল বাছাই পেরিয়ে। ফিফা ও রয়টার্স বলছে, এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এবং নতুন কোচ জুলেন লোপেতেগির অধীনে দলটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে চাইছে। গ্রুপ বি-তে কানাডা, বসনিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচগুলোতে কাতারের লক্ষ্য হবে আগে প্রতিরোধ গড়া, তারপর সুযোগ তৈরি করা।
সৌদি আরব
সৌদি আরবের সম্ভাবনা সব সময়ই “স্পয়লার” হওয়ার। এটি তাদের সপ্তম বিশ্বকাপ; ১৯৯৪ সালের শেষ ষোলোই তাদের সেরা ফল। কিন্তু রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোচ বদল, অনিশ্চিত ফর্ম আর প্রস্তুতির ওঠানামা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। গ্রুপ এইচ-এ স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে কাজটা কঠিন, তাই সেখান থেকে বের হতে হলে রক্ষণভাগকে প্রায় নিখুঁত হতে হবে।
জর্ডান
জর্ডানের জন্য এবারের বিশ্বকাপ এক ঐতিহাসিক অর্জন। রয়টার্স বলছে, ২০২৫ সালের জুনে তারা প্রথমবার বিশ্বকাপে ওঠে, আর গ্রুপ জে-তে আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে পড়ায় নকআউটের চেয়ে প্রথমে সম্মানজনক প্রতিযোগিতাই হবে মূল লক্ষ্য। তবু এই অভিষেকই জর্ডানকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্পগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
উজবেকিস্তান
উজবেকিস্তানের প্রথম বিশ্বকাপ এশিয়ার ফুটবলে নতুন একটি নামের উত্থান। ফিফা ও রয়টার্স বলছে, মনোমুগ্ধকর এই যাত্রার নেতৃত্বে আছেন কোচ ফাবিও ক্যানাভারো, আর দলে আছেন আব্দুকোদির খুসানভ ও এলদর শোমুরোদভের মতো নাম। গ্রুপ কে-তে পর্তুগাল, কলম্বিয়া ও ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে তারা আন্ডারডগ, কিন্তু ডিফেন্সিভ শৃঙ্খলা থাকলে এক-দুটি চমক তারা দিতেই পারে।
ইরাক
ইরাকের ফেরা সবচেয়ে আবেগঘন গল্পগুলোর একটি। ৪০ বছর পর তারা আবার বিশ্বকাপে এসেছে, এবং ১৯৮৬ সালে গ্রুপে শেষ হওয়া দলটি এবার প্রথম পয়েন্টের লক্ষ্য নিয়ে নামবে। গ্রুপ আই-এ ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ের মতো প্রতিপক্ষ থাকায় এটি এশিয়ার সবচেয়ে কঠিন ড্রগুলোর একটি, তাই ইরাকের সাফল্য হবে মূলত প্রতিটি ম্যাচে প্রতিরোধ আর আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষা।
কোন দলগুলোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি?
আমার বিশ্লেষণে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী নকআউট-প্রার্থী। অস্ট্রেলিয়া ও ইরান অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের কারণে মাঝারি-উচ্চ সম্ভাবনার দলে থাকে। কাতার ও সৌদি আরব যদি দ্রুত ছন্দ ধরতে পারে, তবে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসার লড়াইয়ে থাকবে। আর জর্ডান, উজবেকিস্তান ও ইরাক—তাদের জন্য এবারের আসল লক্ষ্য হবে প্রথমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলা, তারপর চমকের দরজা খুলে রাখা। এই মূল্যায়ন দলগুলোর সাম্প্রতিক বাছাই পারফরম্যান্স, বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা এবং গ্রুপের শক্তিমত্তার ওপর ভিত্তি করে করা।
এশিয়ার এই ৯ দলই এবারের বিশ্বকাপে মহাদেশটির সবচেয়ে বড় পরিচয়পত্র। কারও লক্ষ্য শিরোপার স্বপ্ন, কারও লক্ষ্য প্রথম জয়, আবার কারও লক্ষ্য শুধু প্রথম অভিষেকের মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু একসঙ্গে তারা দেখিয়ে দিচ্ছে—এশীয় ফুটবল এখন আর উপস্থিতির জন্য নয়, প্রতিযোগিতার জন্যও বিশ্বকাপে যায়।



