১ জুন থেকে কার্যকর হচ্ছে নয়া প্রজ্ঞাপন; মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রধান শিক্ষকদের, ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি স্বাধিকার ভঙ্গের প্রশ্ন
কলকাতা | ২৩ মে ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুল ও মাদ্রাসায় দৈনিক প্রার্থনাসভায় জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীন মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ গত ১৯ মে এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করেছে। এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাজ্যের সব সরকারি, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত, অনুমোদিত এবং বেসরকারি মাদ্রাসায় আগামী ১ জুন গরমের ছুটি শেষে প্রতিষ্ঠান খোলার দিন থেকে এই নিয়ম কার্যকর করতে হবে।
এর আগে রাজ্যের সাধারণ স্কুলগুলোর জন্যও একই নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। সাবেক তৃণমূল সরকারের আমলে প্রার্থনাসভায় রাজ্য সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গাওয়ার যে নিয়ম ছিল, নতুন প্রজ্ঞাপনে তা পরিবর্তন করে জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন-অধিনায়ক-জয় হে’র পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত ‘বন্দে মাতরম’ যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শিক্ষাবিদ, প্রধান শিক্ষক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আইনি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
নয়া নির্দেশিকার পরিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য
মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের এই প্রজ্ঞাপনটি রাজ্যের বিশাল একটি অংশ জুড়ে কার্যকর হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
- ৬১৪টি সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসা এই আদেশের আওতাভুক্ত।
- ১২টি সরাসরি সরকারি ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসা।
- ৩৫০টির মতো পর্ষদ অনুমোদিত মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র ও শিশু শিক্ষা কেন্দ্র।
- ৬৮০টি সরকারি অনুদানবিহীন (বেসরকারি) মাদ্রাসা, যারা এই নয়ারীতির আওতার মধ্যে আসবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিতর্কের উৎস
১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানটির এবার ১৫৯ বছর পূর্ণ হলো। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে এটি তাঁর বিখ্যাত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত হয়। গানটির প্রথম দুটি স্তবকে মূলত দেশমাতৃকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বন্দনা করা হলেও, পরবর্তী চারটি স্তবকে হিন্দু দেবী দুর্গার স্তুতি এবং মন্দিরে প্রতিমা গড়ে পূজার বিবরণ রয়েছে। এই ধর্মীয় অনুষঙ্গের কারণে গানটি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।
১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি বুদ্ধদেব বসুকে লেখা এক চিঠিতে হিন্দু দেবীর স্তবগাথা মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরুও এই বিষয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে চিঠি লিখে সংখ্যালঘুদের আপত্তির আশঙ্কার কথা জানান। পরবর্তীতে কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে গানটির প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংবিধানেও কেবল প্রথম দুটি স্তবককে ‘জাতীয় গান’ (National Song) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় গানের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সব অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের ছয়টি স্তবকই পূর্ণাঙ্গ সংস্করণে গাওয়ার নির্দেশ দেয়। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর রাজ্য সরকার যে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তাতে গানটির প্রথম দুটি স্তবক গাইতে হবে নাকি পুরো ছয়টি স্তবকই গাইতে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই।
প্রধান শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
সরকারের এই আকস্মিক নির্দেশিকা বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে। কেউ একে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচের পরিপন্থী বলে দাবি করছেন।
বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের রাজ্য সভাপতি ইসারুল হক মণ্ডল বলেন,
সরকারের এই আকস্মিক নির্দেশিকা বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে। কেউ একে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচের পরিপন্থী বলে দাবি করছেন।
বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের রাজ্য সভাপতি ইসারুল হক মণ্ডল বলেন,
”একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি সরকারি নির্দেশিকা মানতে বাধ্য। কিন্তু এটা বুঝতে হবে, স্কুল ও মাদ্রাসার মধ্যে পার্থক্য আছে। মাদ্রাসা একটি সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভারতীয় সংবিধান সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার দেয়। এই সংস্কৃতির সঙ্গে দেশাত্মবোধকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।”
উত্তর দিনাজপুরের রাহাতপুর হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শাহীদুল রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”মন থেকে দেশপ্রেম না এলে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মুসলমানেরা একেশ্বরবাদী, তাই দেবীর স্তুতি সংবলিত স্তবকগুলো নিয়ে ধর্মীয় আপত্তি আছে। একজনের ধর্মীয় আচার অন্যের ওপর চাপানো অসংবিধানিক। আমি এই নির্দেশিকা কার্যকর করার আগে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলব, তারা সম্মতি না দিলে এটি কার্যকর করব না। প্রয়োজনে শাস্তির মুখামুখি হতেও আমার আপত্তি নেই।”
অন্যদিকে, নিউটাউন হাতিয়ারা হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক এসকার আলী শেখ বাস্তবতার নিরিখে বলেন,
”শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আমরা মাদ্রাসা পর্ষদের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য। সরকারি পদে যখন রয়েছি, তখন সরকারি নির্দেশিকা অমান্য করতে পারি না। এখানে প্রতিবাদের সুযোগ নেই।”
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মুন্নিরিয়া হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ইসারুল নির্দেশিকার অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে আগের প্রচলিত নিয়মাবলী বাতিল। কিন্তু সেখানে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় গান গাইতে হবে কি না, বা ডায়েরিতে কীভাবে নোট করতে হবে—তা স্পষ্ট নয়। আমরা অভিভাবক ও ছাত্রদের কাছে কী ব্যাখ্যা দেব, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই বিতর্কের জবাবে বিজেপির রাজ্য মুখপাত্র বিমলশঙ্কর নন্দ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন,
”এখানে দেবী দুর্গার রূপে দেশমাতৃকার বন্দনা করা হয়েছে। পুরো গানটাই দেশের জন্য, দেবীর সঙ্গে কেবল তুলনা করা হয়েছে। এটি দেবী দুর্গার পূজা নয়, আদতে দেশের বন্দনা। সব ধর্মের মানুষই দেশকে ভালোবাসেন, তাই এতে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগার কোনো কারণ নেই ও আপত্তি থাকা উচিত নয়।”
১ জুন মাদ্রাসাগুলো খোলার পর মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশিকা কতটুকু বাস্তবায়িত হয় এবং এটি নিয়ে কোনো আইনি চ্যালেঞ্জ বা আদালতের হস্তক্ষেপ আসে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
⚠ মূল বিষয়গুলো (Key Takeaways)
বাধ্যতামূলক নিয়ম: পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুল ও মাদ্রাসার প্রার্থনাসভায় ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কার্যকরী তারিখ: আগামী ১ জুন ২০২৬ থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।
অস্পষ্টতা: নির্দেশিকায় গানটির প্রথম দুটি স্তবক নাকি পূর্ণাঙ্গ ছয়টি স্তবক গাইতে হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
সাংবিধানিক বিতর্ক: ভারতীয় সংবিধানের ২৯ ও ৩০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার যে অধিকার রয়েছে, এই নির্দেশ তার লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ধর্মীয় আপত্তি: মুসলিম শিক্ষাবিদদের মতে, গানটির শেষ চার স্তবকে মূর্তিপূজার উল্লেখ থাকায় তা একেশ্বরবাদী মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
📌 তথ্যসূত্র:
পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ (WBBME) সরকারি বিজ্ঞপ্তি, বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতি, ডয়চে ভেলে (DW)



