Homeটুডে ওয়ার্ল্ডবিশ্বের মানচিত্রে পরিবর্তন: কোন দেশগুলোর অস্তিত্ব টিকবে না

বিশ্বের মানচিত্রে পরিবর্তন: কোন দেশগুলোর অস্তিত্ব টিকবে না

ঢাকা | ২২ মে ২০২৬

ভূ-রাজনৈতিক সীমানাগুলো আপাতদৃষ্টিতে স্থায়ী মনে হলেও ইতিহাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির আলোতে অনেক দেশের ভবিষ্যৎ এখন চরম উদ্বেগের মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক দ্বীপ-রাষ্ট্রের নিম্নাঞ্চল যেমন প্লাবিত হচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক ও জাতিগত বিভাজনের কারণে অনেক দেশে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের অস্তিত্ব ও মানচিত্র আমূল বদলে যেতে পারে।

🌊 জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় ও দ্বীপ-রাষ্ট্র

  • মালদ্বীপ: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক মিটার উঁচু এই দ্বীপরাষ্ট্রটি সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে তীব্র সংকটে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে মালদ্বীপের বড় অংশ প্লাবিত হবে। দেশটির সাবেক পরিবেশমন্ত্রী মোহামেদ আসলাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, “আমরা আমাদের দেশে বেঁচে থাকতে সবকিছু করব।” তবে সমুদ্রের পানি দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দেশটি ইতিমধ্যে তার নাগরিকদের জন্য বিকল্প বাসস্থান খুঁজতে শুরু করেছে।
  • কিরিবাতি ও টুভালু: প্রশান্ত মহাসাগরের এই নিম্নভূমি রাষ্ট্রগুলোও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছে। কিরিবাতি সরকার ইতিমধ্যে নাগরিকদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য ফিজিতে ২০ বর্গকিলোমিটার জমি কিনেছে এবং পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, টুভালুর সমুদ্রপৃষ্ঠ গত ৩০ বছরে প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে আরও ২০ সেন্টিমিটার বাড়ার পূর্বাভাস আছে। আইপিসির তথ্য অনুযায়ী, টুভালুর অধিকাংশ ভূমি ২০৫০ সালের মধ্যে সাগরে বিলীন হয়ে যাবে। এই বাস্তবতায় নিউজিল্যান্ড প্রতি বছর টুভালুর মাত্র ৭৫ জন নাগরিককে স্থায়ী বসবাসের জন্য বিশেষ ভিসা দিচ্ছে, যেখানে দেশটির মোট জনসংখ্যা ১১ হাজারেরও বেশি।
  • বাংলাদেশ ও পাকিস্তান: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র এবং সিন্ধু (ইন্দাস) উপত্যকার নিচু অঞ্চলগুলো দীর্ঘকাল ধরে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু-সংকটজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র বর্ষা ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেছে, যা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরতে বাধ্য করছে। এই দুই দেশের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ ২০৫০ সালের মধ্যে বন্যা ও খরা ঝুঁকিতে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ভাঙন-ঝুঁকি

  • বেলজিয়াম: ভাষা ও সাংস্কৃতিক বিভাজন এই ইউরোপীয় দেশটিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে। ডাচ-ভাষী ফ্ল্যান্ডার্স এবং ফরাসি-ভাষী ওয়ালোনিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। ব্রাসেলস এই দুই অংশের একমাত্র সংযোগস্থল হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা দেশকে দ্বিখণ্ডিত করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বেলজিয়ামের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দক্ষিণ ফ্লেমিশ জাতীয়তাবাদী পার্টির নেতা বার্ট দে ওয়েভের ক্ষমতায় আসা এই কাঠামোগত বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
  • যুক্তরাজ্য: ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট ব্রিটিশ ইউনিয়নের ঐক্যের প্রশ্নে নতুন বাধার সৃষ্টি করেছে। স্কটল্যান্ডের ৬২ শতাংশ মানুষ ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল, যার ফলে সেখানে স্বাধীনতার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। সাম্প্রতিক ইংল্যান্ড–স্কটল্যান্ড–ওয়েলস নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী প্রার্থীরা এগিয়ে আসায় এই শতাব্দীপ্রাচীন ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার হুমকি আরও উসকে গেছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডেও সিন ফেইন পার্টির নেত্রী মিশেল ও’নিল আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন।
  • বোসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: ১৯৯৫ সালের ডেটন শান্তি চুক্তি অনুযায়ী দেশটি দুই ভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত। বর্তমানে স্বাধীনতাবাদী নেতা মিলোরা দোদিক বারবার ‘রেপাবলিকা সারপস্কা’ নামের সার্ব এলাকাকে আলাদা করার হুমকি দিচ্ছেন। সম্প্রতি ওই অঞ্চলের সংসদ কেন্দ্রীয় সংবিধান আদালতের রায় কার্যকর করা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আইন বিশেষজ্ঞরা ‘আইনি বিচ্ছিন্নতা’ হিসেবে দেখছেন।
  • স্পেন: কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্পেনের উদার গণতন্ত্রকে সংকটে ফেলেছে। ২০১৭ সালে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা গণভোটের পর স্পেন সরকার পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থিতু হয়নি। বাস্ক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিও স্পেনের ভেতরের বিভাজনকে আরও গভীর করছে।

🌍 মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

  • ইরাক: ঔপনিবেশিক আমল থেকে চাপিয়ে দেওয়া সীমানা দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন তৈরি করেছে। শিয়া-আধিপত্যের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সুন্নি অঞ্চল এবং স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানের দূরত্ব তীব্র। কুর্দি অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী এবং তেল শিল্প রয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইরাকের মানচিত্রটি শেষ পর্যন্ত সুন্নি, শিয়া (ইরানপন্থী) এবং কুর্দি অংশে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।
  • লিবিয়া: ২০১১ সালে মুয়াম্মান গাদ্দাফির পতনের পর থেকে দেশটিতে কোনো একক রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে দেশ দুটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে ত্রিপোলিটানিয়া (পশ্চিম), সিরেনাইকা (পূর্ব) এবং ফেজান (দক্ষিণ) নামে ঐতিহাসিক বিভাজনে বিভক্ত। বিশ্বের অন্যতম বড় তেলভান্ডার থাকা সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্যের অভাব এবং পূর্ব লিবিয়ার প্রশাসন সব তেলক্ষেত্র বন্ধের হুমকি দেওয়ায় দেশটির ভাঙন প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
  • ইয়েমেন: গত এক দশকের গৃহযুদ্ধ দেশটিকে একটি কার্যক্ষম রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কতগুলো অঞ্চলে পরিণত করেছে। উত্তর-পশ্চিমে হুথি বিদ্রোহী, উত্তরে রাষ্ট্রীয় প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল এবং দক্ষিণে স্বাধীনতাবাদী দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দেশকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে। জাতিসংঘ জানায়, বর্তমানে অন্তত ১৭ মিলিয়ন ইয়েমেনি তীব্র খাদ্য ঘাটতির মুখে। ১৯৯০ সালের উত্তর–দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভাজন থেকে শিক্ষা নিয়ে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আনুষ্ঠানিক মানচিত্র থাকলেও ইয়েমেনের বাস্তব অস্তিত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে।
  • সোমালিয়া: আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও রাজধানী মোগাদিশুর বাইরে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বাস্তব নিয়ন্ত্রণ নেই। দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে আল-শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠী সক্রিয়, আর সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সাল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রশাসন চালাচ্ছে। সোমালিল্যান্ডকে কিছু আন্তর্জাতিক পক্ষ আংশিক বা পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়ায় এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

🏚️ হাইতি, সাইপ্রাস ও মলদোভার সংকট

  • হাইতি: প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিবেশগত দুর্যোগ এবং গ্যাং সংস্কৃতির যৌথ প্রভাবে দেশটির সরকারি কাঠামো পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত। রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন সশস্ত্র গ্যাংদের হাতে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের উপস্থিতি ‘চরম সীমিত’ হওয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে পৌঁছেছে, যা রাষ্ট্রটির আনুষ্ঠানিক পতনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
  • সাইপ্রাস: ১৯৭৪ সাল থেকে সাইপ্রাস দ্বীপটি গ্রীক-সাইপ্রাস ও তুর্কি-সাইপ্রাস নামে দুই ভাগে বিভক্ত। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় পুনর্মিলন আলোচনার চেষ্টা হলেও গ্রীক-সাইপ্রাসরা দ্বি-জাতীয় ফেডারেশনে এবং তুর্কি-সাইপ্রাসরা সম্পূর্ণ আলাদা দুই রাষ্ট্রের সমাধানে বিশ্বাসী, যা দ্বীপটির স্থায়ী বিভাজনকে অবধারিত করছে।
  • মলদোভা: পূর্ব ইউরোপের এই ক্ষুদ্র দেশটি রুশ-সহায়ক প্রদেশ ট্রান্সনিসট্রিয়া এবং উপজাতি-ভিত্তিক গ্যাগাউজিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতায় জর্জরিত। ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের পর মলদোভা সংবিধানে ইইউতে যোগদানের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করায় অভ্যন্তরীণ এই বিভাজন আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মলদোভার ভবিষ্যৎ হয়তো রোমানিয়ার সঙ্গে পুনর্মিলনে অথবা স্থায়ী রাজনৈতিক বিভাজনে রূপ নেবে।

📌 ভবিষ্যৎ করণীয় ও বিশ্লেষক পরামর্শ

বর্তমান এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে অনেক চেনা রাষ্ট্রের নাম মুছে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট মোকাবেলায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে বৈশ্বিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান এবং জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের দাবিগুলোকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমন্বয় করা জরুরি। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ (UNICEF) ইতিমধ্যে ইয়েমেন ও হাইতির মতো ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোর জন্য সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচি শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত এই দেশগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং দূরদর্শী নীতি নির্ধারণের ওপরই নির্ভর করছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স নিউজ এজেন্সি, দ্য গার্ডিয়ান, নাসা (NASA) এবং জাতিসংঘের জলবায়ু ও মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন (মে ২০২৬)।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments