চাকরির প্রলোভনে শ্যালককে ডেকে এনে সপরিবারে হত্যা; লাশের ওপর পড়ে ছিল অদ্ভুত ‘অভিযোগপত্র’
গাজীপুর | শনিবার, ৯ মে ২০২৬
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী, তিন শিশু সন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন মো. ফোরকান মিয়া (৪০) নামের এক ট্রাকচালক। শুক্রবার (৮ মে) দিবাগত রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতক ফোরকান নিজেই স্বজনদের ফোন করে খুনের কথা স্বীকার করে গা ঢাকা দিয়েছেন।
শনিবার (৯ মে) সকালে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার যারা
নিহতরা হলেন ঘাতক ফোরকানের স্ত্রী শারমিন খানম (৪০), তাদের তিন কন্যাসন্তান— মিম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২) এবং ফোরকানের শ্যালক রসুল (২২)। নিহত শারমিন ও ফোরকান উভয়েরই আদি বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়।
নৃশংসতার চিত্র ও প্রেক্ষাপট
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ফোরকান তার শ্যালক রসুলকে সাড়ে ১৯ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ডেকে এনেছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় রসুল তার বোনের বাসায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
- শারমিনকে নির্যাতন: ফোরকানের স্ত্রী শারমিনকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।
- সন্তানদের করুণ পরিণতি: তিন শিশু সন্তানকে বিছানায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
- স্বীকারোক্তি: রাত ১২টার দিকে ফোরকান তার নিজের ভাইকে ফোনে জানান, তিনি পরিবারের কাউকেই জীবিত রাখেননি।
🔎 রহস্যময় ‘অভিযোগপত্র’ ও নেপথ্য কারণ
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো, প্রতিটি লাশের ওপর কম্পিউটার টাইপ করা একটি করে অভিন্ন ‘অভিযোগপত্র’ পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি বরাবর লেখা ওই কাগজে ফোরকান তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া এবং ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ তুলেছেন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং পারিবারিক কলহ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে নিহত শারমিনের পরিবার দাবি করেছে, ফোরকান দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের জন্য শারমিনকে নির্যাতন করছিলেন এবং মাদক সেবনের কারণেই তিনি এত বড় নিষ্ঠুরতা ঘটিয়েছেন।
📊 হত্যাকাণ্ডের টাইমলাইন ও আলামত
- শুক্রবার সকাল: শ্যালক রসুলকে চাকরির কথা বলে ফোন করেন ফোরকান।
- শুক্রবার সন্ধ্যা: রসুল কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামে বোনের বাসায় পৌঁছান।
- শুক্রবার দিবাগত রাত: পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা।
- শনিবার ভোর: পুলিশ কর্তৃক পাঁচটি গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার।
- জব্দকৃত আলামত: মরদেহের পাশ থেকে মামলার নথিপত্র (অভিযোগপত্র) এবং ঘর থেকে মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
💬 প্রশাসনের বক্তব্য
গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন:
”প্রতিটি লাশের ওপর অভিযোগের কপি রাখা ছিল। এটি কেবল চিরকুট নাকি কোনো থানায় জমা দেয়া হয়েছিল, তা যাচাই করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষোভ থেকেই এই নৃশংসতা।”
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন জানিয়েছেন, ঘাতক ফোরকানকে গ্রেফতারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে।
উপসংহার: ঘাতক কি দেশ ছাড়ার অপেক্ষায়?
নিহত শারমিনের ভাই শাহীন মোল্লা অভিযোগ করেছেন, ফোরকান আগে থেকেই পাসপোর্ট তৈরি করে রেখেছিলেন এবং শনিবারই তার দেশের বাইরে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। ঘাতক যাতে সীমান্ত পাড়ি দিতে না পারে, সে লক্ষ্যে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। বর্তমানে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে।



