আইনি প্যাঁচ এড়াতে ত্রিপুরার ভুঁইফোড় ‘এনসিপিএন’ দলে তৃণমূলের ২০ সংসদ সদস্য; নেপথ্যে বিজেপির এনডিএ জোটের কৌশলগত চাল
নয়াদিল্লি/কলকাতা | ১৫ জুন ২০২৬
ভারতের লোকসভা রাজনীতি এবং পূর্ব ভারতের কৌশলগত ভূখণ্ড পশ্চিমবঙ্গে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। রাজ্যটিতে ক্ষমতা হারানোর মাত্র এক মাসের মাথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) জাতীয় স্তরে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো। দলটির ২০ জন প্রভাবশালী লোকসভা সদস্য (MP) দলত্যাগ করে ভারতের কঠোর ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ (Anti-Defection Law) এড়াতে ত্রিপুরার একটি নামসর্বস্ব দলে যোগ দিয়েছেন। এই কৌশলগত পদক্ষেপটি দিল্লির লোকসভা স্পিকারের দপ্তরে নিবন্ধিত হওয়ার পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার একচ্ছত্র আধিপত্য এখন ‘তাসের ঘরের’ মতো ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে।
🌍 কী ঘটেছে
গত রোববার (১৪ জুন ২০২৬) সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের ২০ জন ‘বিদ্রোহী’ এমপি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রিপুরাভিত্তিক একটি আঞ্চলিক দল, ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (NCPI)-তে যোগদানের ঘোষণা দেন।
তবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দলটির প্রকৃত নাম ‘এনসিপিএন’ (NCPN)। ২০২৩ সালে এটি একটি ‘রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি’ (RUPP) বা অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে ধলাই জেলার চৌমানু এবং ঊনকোটি জেলার কৈলাসহর কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়ে এই দলটি পুরো রাজ্যে মাত্র ৮২২টি ভোট পেয়েছিল। ত্রিপুরার মাটিতে যে দলের কোনো বাস্তব রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা চেনা কার্যালয় নেই, সেই দলের ছাতার নিচেই আশ্রয় নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের হেভিওয়েট সংসদ সদস্যরা।
⚔️ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার ভূরাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
- আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য: গত এক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেস দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক আন্তর্জাতিক ও সীমান্ত নীতিতে একপ্রকার ‘ভেটো’ বা বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
- কেন্দ্র-রাজ্য একীকরণ: এই ভাঙনের ফলে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) জোট পূর্ব সীমান্তে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। এর ফলে ভারতের কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ (চিকেনস নেক) এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সংযোগকারী ট্রানজিট রুটগুলোর ওপর দিল্লির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হবে।
🏛 কারা জড়িত
- তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী: কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই ব্লকে আছেন শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ, ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান, চলচ্চিত্র তারকা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী (দেব), পার্থ ভৌমিক, মালা রায় এবং অরূপ চক্রবর্তীসহ মোট ২০ জন এমপি।
- তৃণমূলের মূল ধারা: দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এই ভাঙন রুখতে আইনি লড়াই শুরু করেছেন।
- দিল্লির নীতিনির্ধারক: লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং বিজেপির শীর্ষ কৌশলবিদরা, যারা এই দলত্যাগকে নেপথ্য থেকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
- আঞ্চলিক পর্যবেক্ষক: ত্রিপুরার বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী (সিপিএম) এবং ত্রিপুরা বিজেপির সাবেক সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য।
📊 কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল (10th Schedule) অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত আইনপ্রণেতা যদি তাঁর মূল দল ত্যাগ করেন, তবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে যায়। তবে যদি কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্য একসঙ্গে কোনো অন্য দলের সঙ্গে ‘একীভূত’ (Merge) হন, তবে তাদের পদ টিকে থাকে।
তৃণমূলের এই ২০ জন এমপি আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করতেই এই ভুঁইফোড় দলটিকে বেছে নিয়েছেন। তারা লোকসভায় নিজেদের আসন টিকিয়ে রেখে বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ (NDA)-কে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন। এর ফলে:
- ট্যাক্টিক্যাল মার্জার: সম্পূর্ণ নতুন দল গঠন করতে গেলে যে দীর্ঘ আইনি ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, ত্রিপুরার একটি পকেট-পার্টিকে ‘হাইজ্যাক’ করার মাধ্যমে সেই সময় ও জটিলতা এড়ানো গেছে।
- অর্থনৈতিক প্রভাব: পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা হতে যাচ্ছে হাওড়া জেলা। এর ফলে রাজ্যে কেন্দ্রীয় শিল্প বিনিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন বাজেট (যা এতদিন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের কারণে আটকে ছিল) দ্রুত ছাড় পাওয়ার পথ সুগম হবে।
🌏 আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও বাংলাদেশ
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে:
- তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি: তিস্তা নদী দীর্ঘ এক দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে অমীমাংসিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের সাথে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এবং সীমান্ত বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি এগিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।
- ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যে রেল ও সড়ক ট্রানজিট প্রজেক্টগুলো চলমান রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা কেন্দ্র-অনুকূল পরিবেশ সেই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতিশীল করবে।
📅 ঘটনাপঞ্জি
- মে ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ও রাজনৈতিক সমীকরণে ঐতিহাসিক ক্ষমতা হারায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস।
- ২০২৩: ত্রিপুরায় আরইউপিপি (RUPP) হিসেবে ‘এনসিপিএন’ দলের আত্মপ্রকাশ; নির্বাচনে মাত্র ৮২২ ভোট লাভ।
- ১৪ জুন ২০২৬ (দুপুর): তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে দলটিকে ‘অখণ্ড’ রাখার দাবি জানান।
- ১৪ জুন ২০২৬ (সন্ধ্যা): ২০ জন বিদ্রোহী এমপি স্পিকারের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিআই (NCPN)-তে যোগদানের নথিপত্র জমা দেন।
💬 গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
“তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল। আইনতও তৃণমূল একটিই। লোকসভার সংসদীয় দলের মধ্যে কোনো পৃথক বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে যেন স্পিকারের দপ্তর থেকে স্বীকৃতি দেওয়া না হয়।”
— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, তৃণমূল কংগ্রেস।“আমরা আইনি প্যাঁচ এড়াতেই এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা নতুন দলে যোগ দিলেও কেন্দ্রে এনডিএ (NDA) সরকারকেই সমর্থন করব। খুব শীঘ্রই আমরা পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে আমাদের নতুন দলের অফিস খুলব, যার ঠিকানা হবে হাওড়া।”
— অরূপ চক্রবর্তী, তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্য।“ত্রিপুরার মাটিতে এই নামে কোনো রাজনৈতিক দলের বাস্তব অস্তিত্ব বা কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি আছে বলে আমার জানা নেই। রাজনৈতিক স্বার্থে হয়তো কোনো কাগজি সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
— দীপন্ত মজুমদার, বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ত্রিপুরা।
🧭 এরপর কী
১. স্পিকারের রুলিং: লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এই ২০ জন এমপির দলত্যাগকে ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী বৈধ ‘একত্রীকরণ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সংসদ সদস্যদের ভাগ্য।
২. আদালতের দ্বারস্থ তৃণমূল: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল দল সুপ্রিম কোর্টে স্পিকারের যেকোনো সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাতে যাচ্ছে।
৩. পশ্চিমবঙ্গের রাজপথের লড়াই: নতুন দলটির কার্যালয় হাওড়ায় খোলার ঘোষণা দেওয়ায় আগামী দিনগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তৃণমূলের মূল ধারার কর্মীদের সঙ্গে এই দলত্যাগীদের মাঠপর্যায়ের সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
📌 তথ্যসূত্র
- ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের তালিকা (২০২৩-২০২৬)।
- আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা (১৫ জুন ২০২৬ সংস্করণ)।
- লোকসভা সচিবালয় ও স্পিকারের কার্যালয়ের কার্যবিবরণী নথি।
- টুডে টিভি বিডি ডিপ্লোম্যাটিক ও আঞ্চলিক ব্যুরো রিপোর্ট।



