Homeটুডে টেকNSAVE: চকচকে অ্যাপের আড়ালে যা লুকিয়ে আছে

NSAVE: চকচকে অ্যাপের আড়ালে যা লুকিয়ে আছে

আপনার কষ্টার্জিত ডলার রাখার আগে যে সত্যগুলো জানা জরুরি
ফেসবুক স্ক্রোল করছেন। হঠাৎ পরিচিত একজন ইনফ্লুয়েন্সারের মুখ। হাসিমাখা ভিডিও। বলছেন, বিদেশ থেকে টাকা আনুন সহজে, সুদ পাবেন ভালো, অ্যাপল পে সাপোর্ট আছে, লন্ডনে অফিস আছে। নাম NSAVE।ফ্রিল্যান্সার ভাই বা বোন, একটু থামুন।

যিনি সতর্ক করছেন, তাঁর পরিচয়
যুক্তরাজ্যে তিনটি ফিনটেক কোম্পানি চালিয়েছেন। তিনটিতেই ছিল FCA-র সরাসরি API — Authorised Payment Institution — লাইসেন্স। যুক্তরাজ্যের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অডিট বারবার পার করেছেন। ফিনটেক দুনিয়ার ভেতরের অন্ধকার কোণগুলো তাঁর চেনা।

একবার তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানই শিকার হয়েছিল। ২০২০ সালে কোভিডের মাঝে একটি পার্টনার ফিনটেক তাঁর কোম্পানির ১.৩ মিলিয়ন ইউরো — বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে আঠারো কোটি টাকা — আত্মসাৎ করে নেয়। সেই মামলা যুক্তরাজ্যে এখনও চলছে। টাকা আজও ফেরেনি।

অথচ সেই বিপর্যয়েও তিনি তাঁর প্রতিটি ক্লায়েন্টের প্রতিটি পয়সা ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলেননি।

এই মানুষটিই আজ NSAVE নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর কথা শোনার যথেষ্ট কারণ আছে।

কাগজে কলমে NSAVE আসলে কী?
NSAVE-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাদের আইনি কাঠামো বা রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কোনো তথ্যই নেই। যুক্তরাজ্যের Companies House-এর সরকারি রেকর্ড ঘাঁটলে যা বেরিয়ে আসে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।

রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৪৩৩৭৯৯৪। ঠিকানা: ১২৪ সিটি রোড, লন্ডন। এটি কোনো প্রকৃত অফিস নয় — এটি একটি ভার্চুয়াল ঠিকানা, যেখানে হাজার হাজার স্টার্টআপ কেবল কাগজে-কলমে নিবন্ধিত থাকে। যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি বলে দাবি করা একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো অফিসই নেই।

কোম্পানিটির পরিচালক দুজন — আমের বারুদি ও আবু হাসেম। এরা যথাক্রমে সিরিয়ান ও ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাঁরা কোথায় থাকেন, তা-ও স্পষ্ট নয়।

আরেকটি তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। NSAVE-এর বর্তমান নাম আগে ছিল না। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই কোম্পানির নাম ছিল ‘মাসরেফ লিমিটেড’ (Masref Ltd)।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে তাদের SIC কোড থেকে। SIC কোড হলো ব্যবসার ধরন নির্ধারণকারী আন্তর্জাতিক শ্রেণিকোড। NSAVE-এর SIC কোড ৬২০৯০ — অর্থাৎ তারা সরকারি খাতায় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো পেমেন্ট কোম্পানিও নয়। তারা নিছক একটি সাধারণ তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

একটি আইটি কোম্পানি কীভাবে আপনার টাকা ব্যাংকে রাখছে?

লাইসেন্সের আসল রহস্য
NSAVE-এর নিজস্ব কোনো EMI লাইসেন্স নেই। ইলেকট্রনিক মানি ইনস্টিটিউশন লাইসেন্স না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান আইনত গ্রাহকের অর্থ ধারণ করতে পারে না।

তাহলে NSAVE করছেটা কী? তারা অন্য কয়েকটি কোম্পানির লাইসেন্স ব্যবহার করে একটি ‘অ্যাপয়েন্টেড ডিস্ট্রিবিউটর’ বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে।

এই ব্যবস্থার বিপদটা বোঝা দরকার। ফিনটেক দুনিয়ায় ব্যাক-এন্ড পার্টনারদের সাথে ঝামেলা হওয়া, হঠাৎ পার্টনারশিপ ভেঙে যাওয়া বা প্যারেন্ট কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাওয়া — এগুলো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেই পরিস্থিতিতে বিপদে পড়বেন আপনি, NSAVE নয়।

আর সুইজারল্যান্ডে তারা যে ‘সুইস স্যান্ডবক্স’ লাইসেন্সের কথা বলে গর্ব করে? স্যান্ডবক্স অর্থই হলো পরীক্ষামূলক পরিবেশ। এখানে পূর্ণ ব্যাংকিং লাইসেন্স নেই। সুইস রেগুলেটর FINMA তাদের সরাসরি পর্যবেক্ষণও করে না।

অ্যাপল পে দেখে বিভ্রান্ত হবেন না
ইনফ্লুয়েন্সাররা বড় করে দেখাচ্ছেন — দেখুন, অ্যাপল পে সাপোর্ট আছে! গুগলে পাঁচ তারার রিভিউ আছে!সত্যটা এই — অ্যাপল পে শুধুমাত্র একটি পেমেন্ট গেটওয়ে, একটি প্রযুক্তিগত সুবিধামাত্র। এটি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপত্র নয়। কাল যদি NSAVE বন্ধ হয়ে যায়, অ্যাপল এসে আপনার টাকা ফেরত দেবে না।

FSCS: যে সুরক্ষা আপনি পাবেন না
যুক্তরাজ্যের যেকোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকে টাকা রাখলে সরকার একটি আইনি গ্যারান্টি দেয়। ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলেও আপনি ৮৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফেরত পাবেন। এই ব্যবস্থার নাম FSCS — Financial Services Compensation Scheme।

NSAVE-এ এই সুরক্ষা নেই!
তারা বলে তোমার টাকা ‘সেফগার্ডড’ — আলাদা অ্যাকাউন্টে রাখা। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা। কোনো আইনি জটিলতায় সেই সেফগার্ডড অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ছাড়িয়ে আনতে আদালতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। পুরো টাকা ফেরত পাবেন কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।


বিনিয়োগ আর নিরাপত্তা এক জিনিস নয়
অনেকে বলছেন, YC আর সেকোইয়া ক্যাপিটালের মতো বিশ্বমানের বিনিয়োগকারীরা NSAVE-এ টাকা ঢেলেছে, তাহলে সমস্যা কী? এই যুক্তিটির একটি বড় ফাঁক আছে।

সেকোইয়া ক্যাপিটাল একসময় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম FTX-এ ২১৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল। সেই বিনিয়োগের পেছনে তাদের নিখুঁত যাচাই-বাছাই থাকা সত্ত্বেও FTX ধসে পড়েছিল।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ আর গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা — এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। YC বা সেকোইয়া উচ্চঝুঁকির প্রবৃদ্ধির ওপর বাজি ধরে। তাদের কোটি ডলারের ফান্ডিং কোনো কোম্পানিকে রাতারাতি ব্যাংকিং লাইসেন্স বা FSCS সুরক্ষা এনে দেয় না।

ফিনটেক যখন নিয়ন্ত্রক জটিলতায় বন্ধ হয়, বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে সামান্য ক্ষতির হিসাব আসে। কিন্তু সাধারণ মানুষের যায় সারা জীবনের সঞ্চয়।

ইনফ্লুয়েন্সার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানে। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা দিনরাত পরিশ্রম করে প্রতিটি ডলার উপার্জন করেন। সেই কষ্টের টাকা কোথায় রাখছেন, সেটা তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছেন এমন কিছু ইনফ্লুয়েন্সার, যাঁরা ফিনটেক রেগুলেশন বোঝেন না, লাইসেন্সের ধরন জানেন না, FSCS সুরক্ষার কথা কখনো শোনেননি। চকচকে অ্যাপের ইন্টারফেস দেখে এবং স্পনসরশিপের অর্থের বিনিময়ে তাঁরা লাখো মানুষকে আর্থিক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

এটা দায়িত্বহীনতা নয় শুধু। এটা একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ।

তাহলে কী করবেন?
বিদেশে উপার্জিত অর্থ রাখতে চাইলে কিছু বিষয় মাথায় রাখুন।

যে প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখবেন, তার নিজস্ব FCA লাইসেন্স আছে কিনা যাচাই করুন। FSCS সুরক্ষা পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত হন। কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন, পরিচালক এবং ব্যবসার শ্রেণি সরকারি রেকর্ডে মিলিয়ে দেখুন। ভার্চুয়াল অফিস, ধার করা লাইসেন্স এবং ‘স্যান্ডবক্স’ শব্দ দেখলে সতর্ক হন।

চকচক করলেই সোনা হয় না। ফিনটেকে এই ভুল করলে পস্তানোর সময়ও নাও পেতে পারেন।

এই প্রতিবেদনটি ভোক্তা-সুরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যসমূহ UK Companies House-এর সরকারি রেকর্ড এবং ফিনটেক শিল্পের অভিজ্ঞ পেশাদারদের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments